যুবলীগ ও আওয়ামী কাউন্সিলরের দখলে চার মার্কেট, বছরে হাতিয়ে নিচ্ছে ৪ কোটি টাকা

0

রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) চারটি মার্কেট এখনও অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। এগুলো হচ্ছে- গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার (পুরানবাজার), সুন্দরবন স্কোয়ার সুপার মার্কেট, আদর্শ মার্কেট বিকল্প ও মহানগর মার্কেট বিকল্প। এসব মার্কেটে ১ হাজার ১৬৯টি নকশাবহির্ভূত দোকান নির্মাণ করে অবৈধভাবে ১৭৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা।

এক্ষেত্রে প্রতি দোকান গড়ে অন্তত ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ২৪ বছর ধরে এসব দোকান চক্রটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে ওই চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদউদ্দীন আহমেদ রতন ও একই ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা মো. শাহাবুদ্দিন। এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশন, পুলিশের আইজি ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মার্কেটগুলোর দোকান মালিক সমিতির নেতারা। যদিও তারা দু’জনই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এদিকে সম্প্রতি ডিএসসিসির মার্কেটের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আশায় বুক বেঁধেছেন। তারা মেয়রের কাছে দাবি জানিয়েছেন, নগর ভবনসংলগ্ন এ চারটি মার্কেটে অভিযান পরিচালনা করে দ্রুততম সময়ের অবৈধ দখলদারদের সরিয়ে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করতে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৯ অক্টোবর পুরান বাজার হকার্স সমিতি (গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার) মার্কেটের অব্যবস্থার বিষয়ে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। সেখানে তারা অভিযোগ করেছেন, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার মার্কেটটি পুনর্নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালে দরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসি। ১৯ অক্টোবর ওই মার্কেট নির্মাণের কার্যাদেশ দেয় ডিএসসিসি। আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পায় অর্পি ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শাহজালাল রিপন। তিনি ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদউদ্দীদ আহমেদ রতনের ভাই বলে দাবি ব্যবসায়ী নেতাদের।

লিখিত অভিযোগে তারা বলেছেন, ডিএসসিসির অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করে দোকানের আকার ছোট করে দোকান সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এ মার্কেটের প্রতিটি ফ্লোরের টয়লেট, লিফট, আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য নির্ধারিত জায়গায় অতিরিক্ত দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। বলা হয়, ডিএসসিসির অনুমোদিত নকশায় প্রথম তলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত ১ হাজার ৬৪৬টি দোকান নির্মাণ করার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ৪০০ দোকান নির্মাণ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া অবৈধভাবে নির্মিত দোকানগুলোর মধ্যে ২০০টি দোকান মেয়র কোটার দাবি করে সেসব দোকান বিক্রি করে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রতন ও একই ওয়ার্ডের যুবলীগ সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট।

গুলিস্তান পুরান বাজার হকার্স সমিতির নেতারা লিখিত অভিযোগে জানান, গুলিস্তান পুরান বাজার বা গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলার দোকানের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ায় ১৫০ থেকে ২০০টি দোকান ডিএসসিসির অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন জনের কাছে ভাড়া দিয়ে দোকান প্রতি বাৎসরিক দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা ভাড়া আদায় করছে। এসব দোকান ভাড়া দিয়ে একই সিন্ডিকেট বছরে অন্তত সাড়ে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এছাড়া গুলিস্তান সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটে ৬৬৯টি নকশাবহির্ভূত দোকান নির্মাণ করে ঢাকা দক্ষিণের ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বিক্রি করেছেন বলে ডিএসসিসির কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। অভিযোগে বলা হয়, ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদউদ্দীন আহমেদ রতনের ঘনিষ্ঠ। তাদের অভিযোগ, শাহাবুদ্দিন এবং কাউন্সিলর রতন বিতর্কিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নাম ভাঙিয়ে ওই মার্কেটে অবৈধ দখলদারিত্ব করেছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটের খোলা জায়গা, বরান্দা, টয়লেটের সিঁড়ি, জেনারেটর রুম, পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণ করেছেন। এছাড়া তারা মার্কেটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পানি, বিদ্যুৎ সেবার নামে অতিরিক্ত বিল আদায় করে পকেটস্থ করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটের মাঝখান বরাবর দক্ষিণ ও উত্তর পাশে দোতলা থেকে একটি সিঁড়ি চারতলা পর্যন্ত উঠে গেছে। ওইসব সিঁড়ির আবার কোনোটি অস্থায়ী ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে। পার্শ্বে একটি জীর্ণশীর্ণ ৪ জন ধারণ ক্ষমতার লিফট লাগানো হয়েছে। সিড়ির দু’পাশে ৮টি করে চার তলায় নতুন ৩২টি দোকান তৈরি করা হয়েছে। প্রতি তলার এক পাশের সিড়ি ভেঙে ৪টি করে ১৬টি দোকান তৈরি করা হয়েছে। এভাবেই সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটে শত শত নকশাবহির্ভূত দোকান তৈরি করেছে অবৈধ চক্রটি। আর এসব কাজে তৎকালীন ডিএসসিসির সম্পত্তি ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা সহযোগিতা করেছেন। গত বছরের ২৭ জানুয়ারি সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের অবৈধ দখলদারিত্ব, নকশাবহির্ভূত দোকান নির্মাণ এবং কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের নিরসন চেয়ে ডিএসসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে এসব তথ্য জানান সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সহ-সভাপতি সামসুল হক দূররানী। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলেও সে সময়ের প্রশাসন ওই মার্কেটের অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কারণ হিসেবে জানা যায়, সে সময় ওই মার্কেটের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তৎকালীন ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সহ-সভাপতি এবং মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম নূরু বলেন, ‘এ মার্কেটের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় ১৯৭৪ সাল থেকে আমি সম্পৃক্ত রয়েছি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও কাউন্সিলর রতনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শাহাবুদ্দিন আমার একটি দোকান জোরপূর্বক দখলকরে অন্যত্র ভাড়া দিয়েছেন। আমি মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির নেতা হলেও আমাদের মার্কেটে ঢুকতে দেয়া হয় না। আমরা এ মার্কেটের নৈরাজ্যের অবসান চাই। এ ব্যাপারে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং দ্রুততম সময়ে সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটসহ গুলিস্তান এলাকার সব মার্কেটে অভিযান পরিচালনার দাবি জানাচ্ছি।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলিস্তান আদর্শ মার্কেটে (বিকল্প) অন্তত শতাধিক নকশাবহির্ভূত দোকান নির্মাণ করে বিক্রি করেছেন কাউন্সিলর রতন ও যুবলীগ নেতা শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন চক্রটি। এ মার্কেটের উন্মুক্ত জায়গা, সিঁড়ি, সমিতির অফিসের জায়গা এবং ছাদে অবৈধভাবে এসব দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব অনিয়ম ও দখলদারিত্ব চললেও ডিএসসিসি কোনো প্রতিকার করতে পারছে না। বর্তমান ডিএসসিসি মেয়রের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির নেতারা। এ মার্কেট সমিতির নির্বাচিত নেতারও মার্কেটে ঢুকতে পারেন না বলে জানা গেছে।

গুলিস্তান মহানগর মার্কেট বিকল্পও কাউন্সিলর রতন ও শাহাবুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ মার্কেটে অবৈধ দোকান নির্মাণ না করলেও তারা দোকান মালিকদের কাছে থেকে নানা ধরনের চাঁদা আদায় করেন। নির্বাচিত দোকান মালিক সমিতি থাকলেও তারা কোনো কাজ করতে পারেন না। যুবলীগ নেতা শাহাবুদ্দিন ও কাউন্সিলর রতন যেভাবে বলেন, সবাইকে সেভাবে চলতে হয়। এ চক্রের হাতে দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তারা এ চক্রের হাত থেকে নিস্তার পেতে চান।

উল্লিখিত অভিযোগ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদউদ্দীন আহমেদ রতন বলেন, ‘যে ব্যবসায়ী নেতারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তারাও অবৈধ দখলদার। তাদের বিরুদ্ধে, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। এসব করে তারা ঢাকা শহরে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। আর নানা কৌশল খাঁটিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় পদও বাগিয়ে নিয়েছেন। এখন তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছেন। এসব আপনারা বিশ্বাস করবেন না। দেখবেন, যেদিন এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ হবে, সেদিন মেয়রের সঙ্গে আমিই নেতৃত্ব দেব।’

ফরিদউদ্দীন আহমেদ রতন আরও বলেন, ‘শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে, এটা সত্য। তাই বলে শাহাবুদ্দিনকে দিয়ে আমি মার্কেটে দখলদারিত্ব করাচ্ছি, এটা প্রমাণ করে না।’ তিনি বলেন, ‘যেসব দোকান মালিক ও সমিতির নেতারা আমার বিরুদ্ধে আপনার কাছে অভিযোগ করেছেন, তাদেরও নানা কুকীর্তি রয়েছে। একদিন সরেজমিন সেসবও আপনাকে দেখাব।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, আমার এসব মার্কেটে দোকান আছে এবং আমি সমিতির পদে রয়েছি। আমি আমাদের কাজগুলো সঠিকভাবে পালন করি। বিভিন্ন সমিতির নেতারা যেসব অভিযোগ করছেন তার কোনো সত্যতা নেই। এই বলে তিনি তার পাশে থাকা ডিএসসিসির ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রতনকে ফোনটি ধরিয়ে দেন। কাউন্সিলর এসব অভিযোগের সত্যতা নেই বলে একই দাবি করেন।

তথ্য সূত্র: যুগান্তর

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com