ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম প্রতিশ্রুতি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ সকাল ১১টায় রাজধানীর বনানী এলাকার টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) আয়োজিত অনুষ্ঠানে পারভীন বেগমের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিয়ে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর একে একে কড়াইল বস্তি এলাকার ১৭টি পরিবারের নারী প্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ল্যাপটপে বাটন প্রেস করে একযোগে ১৪টি জেলায় ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। বাটন প্রেস করার সঙ্গে সঙ্গে একযোগে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীর বিকাশ একাউন্টে ২৫০০ টাকা করে জমা হয়ে যায়। ক্ষমতাগ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মধ্যে নির্বাচনী এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান। পাইলটিং কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৪টি জেলার ১৩ সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীর হাতে এই কার্ড বিতরণ করা হয়। কড়াইল বস্তি ছাড়াও আজ মিরপুর অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি, রাজবাড়ীয় পাংশা, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনায় খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ডের কর্মসূচি একযোগে চালু করেন সরকারের দায়িত্বশীল নেতারা।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবু ইউছুপ ফ্যামিলি কার্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এছাড়া
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. জাহিদ হোসেন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক, বিমান প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, মৎস্য প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ ঢাকার বিভিন্ন আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ও সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, পাইলটিং কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৪টি জেলার ১৩ সিটি কর্পোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতিটি খানার তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও তালিকা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটি সরেজমিনে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, পরিবারে ব্যবহৃত আসবাব ও গৃহস্থালী সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি), রেমিট্যান্স প্রবাহ ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং সংগৃহীত তথ্য ইউনিয়ন কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা তালিকা উপজেলা কমিটি অধিকতর যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগীর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে সারাদেশে মোট ৬৭৮৫৪ টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচীর আওতায় যোগ্য উপকারভোগীগণ পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক ২৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরবর্তীতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
জানা যায়, পাইলটিং পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র সূচক মান নির্ণয়ের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্ত শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ৫১৮০৫ টি খানার (Household) তথ্য যাচাইয়ে ৪৭৭৭৭ টি খানার তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্য হতে ডাবল ডিপিং (একই ব্যক্তির একাধিক ভাতা গ্রহণ), সরকারি চাকুরি, পেনশন ইত্যাদি কারণে চূড়ান্তভাবে ৩৭৫৬৭ টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদানের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। সমগ্র প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র সূচক মানের ভিত্তিতে সম্পন্ন করায় উপকারভোগী নির্বাচনে কোনরূপ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের অবকাশ নেই বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি।
জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি নারী প্রধান পরিবার একটি করে আধুনিক ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। স্পর্শবিহীন (Contactless) চিপ সম্বলিত এই কার্ডে QR Code (বার কোডের তথ্যসহ) ও NFC (Near Field Communication) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে কার্ডটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে। কোন একটি পরিবারের ৫ জন সদস্যের জন্য ১টি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। তবে যৌথ/একান্নবর্তী পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা ৫ এর অধিক হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড প্রদান করার বিষয়টি বিবেচনা করবে সরকার। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান যদি অন্য কোন সরকারি ভাতা/সহায়তা পান সেক্ষেত্রে সেই সকল বিদ্যমান সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে, তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অন্যান্য ভাতা গ্রহণ অব্যহত থাকবে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচীর আওতায় যোগ্য উপকারভোগীগণ পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক ২৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরবর্তীতে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পাইলটিং পর্যায়ে কোন পরিবারের কোন সদস্য সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান হতে বেতন/ভাতা/অনুদান/পেনশন পেয়ে থাকলে, নারী পরিবার প্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারী হিসেবে চাকুরিরত থাকলে উক্ত পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না। এছাড়াও পাইলটিং পর্যায়ে কোন পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে বা বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন: গাড়ি, এসি) থাকলে বা ৫ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে উক্ত পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন মাস পর্যন্ত ৩৮.০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ হতে ফ্যামিলি কার্ড ভাতা জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক একাউন্টে জমা হবে। তথ্য সংগ্রহকালীন সময়েই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক একাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে করে কোন প্রকার বিলম্ব, ভুল একাউন্টে জমা বা কোন প্রকার হস্তক্ষেপ ব্যতীত উপকারভোগীগণ ঘরে বসেই সরাসরি সরকার হতে ভাতা প্রাপ্ত হবেন।
সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানায়, পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন মাস পর্যন্ত ৩৮.০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যার মধ্যে ২৫.১৫ কোটি টাকা (৬৬.০৬%) সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান এবং ১২.৯২ কোটি টাকা (৩৩.৯৪%) কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম প্রণয়ন, কার্ড প্রস্তুতি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হবে। ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।