রোগীর প্রতি চিকিৎসকের দায়িত্ব
মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রাসুল (সা.) উৎসাহিত করেছেন। তিনি নিজেও অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতেন। মহানবী (সা.) হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি; শুধু বার্ধক্যরোগ ব্যতীত।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫)
ইসলামি সভ্যতার সূচনা থেকে মুসলিম সমাজে চিকিৎসকদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তবে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যেহেতু মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, তাই ইসলাম চিকিৎসা ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধও আরোপ করেছে। যাতে চিকিৎসকের স্বার্থ ও রোগীর সেবা পাওয়ার অধিকার সুসংহত হয়।
অভিজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা
অভিজ্ঞ ব্যক্তির দিকনির্দেশনায় চিকিৎসা নেওয়া ইসলামের নির্দেশ। হাদিস শরিফে এসেছে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রাসুল (সা.) তাকে তখনকার প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারেস ইবনে কালদাহর কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৫)
অপর একটি বর্ণনায়ও এসেছে যে জনৈক রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে রাসুল (সা.) গোত্রের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩১৫৬)
চিকিৎসাসেবার উদ্দেশ্য
মুসলিম সমাজে চিকিৎসকদের মর্যাদা সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আলী আবদুল্লাহ সাহাল বলেন, ‘পেশা হিসেবে চিকিৎসা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। কেননা তার আলোচ্য বিষয় মানুষের জীবন, তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মানব প্রকৃতিকে শক্তিশালী করা ও রোগমুক্তি যা পৃথিবীতে মানব প্রেরণের উদ্দেশ্য (আল্লাহর দাসত্ব) পূরণে আবশ্যক। তা ছাড়া এই পেশার মাধ্যমে শরিয়তের অন্যতম ‘উদ্দেশ্য’ পূরণ হয়। সুতরাং তা কোরআনে বর্ণিত ‘ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত।’ (প্রবন্ধ : আখলাকুত তাবিবিল মুসলিম, পৃষ্ঠা : ৪-৫)
ইসলামের দৃষ্টিতে ‘চিকিৎসাবিদ্যা’ অর্জন করা ‘ফরজে কিফায়া’ (সামগ্রিক অবশ্যকরণীয়)। অর্থাৎ উম্মাহর একটি দলকে অবশ্যই সব সময় এই বিদ্যাচর্চায় থাকতে হবে। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘বুদ্ধিবৃত্তিক (ওহিনির্ভর নয় এমন) জ্ঞানগুলোর মধ্যে চিকিৎসা ও হিসাববিজ্ঞান ফরজে কিফায়া। কেননা, মানুষ তার মুখাপেক্ষী।’ (রাওদাতুত-তালিবিন ওয়া উমদাতুল মুফতিয়্যিন : ১০/২২৩)
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলতেন, ‘আমি হালাল-হারাম সংক্রান্ত জ্ঞানের (ইসলামি আইনবিজ্ঞান) পর চিকিৎসার চেয়ে অভিজাত কোনো বিদ্যা সম্পর্কে জানি না।’ (সিয়ারু আলামিন-নুবালা, খন্ড : ১০, পৃষ্ঠা : ৫৭)
চিকিৎসকের জন্য আবশ্যকীয়
রোগীর সেবা বিবেচনায় চিকিৎসকের কিছু বৈশিষ্ট্য ও করণীয় রয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকরা সেগুলো নির্ণিত করেছেন। এর কয়েকটি হলো
নিয়তের বিশুদ্ধতা
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সৃষ্টির সেবার নিয়তে রোগীর সেবা করা মুসলিম চিকিৎসকের দায়িত্ব। কেননা বিশুদ্ধ নিয়ত জাগতিক কাজকেও ইবাদতে পরিণত করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই নিয়তের ওপর সব কাজের ফলাফল নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)
বিশ্বাসের শক্তি
মুসলিম চিকিৎসক গভীরভাবে বিশ্বাস করেন তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রচেষ্টা উপলক্ষ মাত্র। রোগমুক্তি ও আরোগ্যের প্রকৃত ক্ষমতা আল্লাহর। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি যখন অসুস্থ হই তিনি আমাকে আরোগ্য দেন।’ (সুরা : আশ-শুআরা, আয়াত : ৮০)
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা
চিকিৎসক তার জ্ঞান, মর্যাদা ও মানবসেবার সুযোগের জন্য মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন। কেননা তা একান্তই আল্লাহর অনুগ্রহ। ইরশাদ হয়েছে, ‘…তুমি যা জানতে না তা তিনি তোমাকে শিখিয়েছেন এবং তোমার প্রতি রয়েছে আল্লাহর মহা অনুগ্রহ।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৩)
সেবা ও চিকিৎসায় যত্ন
মুসলিম চিকিৎসক তার পেশাগত কাজে যতœবান হবেন। কেননা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহ পছন্দ করেন যে, তোমরা যখন কোনো কাজ করবে তাতে তোমরা যতœবান হবে।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস : ১১১৩)
না জেনে চিকিৎসা নয়
মুসলিম চিকিৎসক নিজের অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতা গোপন করে বা নতুন কোনো বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোগের চিকিৎসা করে, অথচ তার প্রতিষেধক তার জানা নেই সে দায়ী বলে গণ্য হবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৭৩০)
রোগীর সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ
রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের আচরণ হবে বন্ধুসুলভ। এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিলে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক আল্লাহ। তুমি বরং তার একজন বন্ধু (বা হিতাকাক্সক্ষী)। তার চিকিৎসক যে তাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪২০৭)
আরোগ্য ও কল্যাণকামিতা
মুসলিম চিকিৎসক রোগীর প্রতি কল্যাণকামী হবেন। তিনি রোগীর জন্য সবচেয়ে উপকারী পরামর্শটি দেবেন। আল্লা বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের কাছে পরামর্শ চায়, সে যেন তাকে উত্তম পরামর্শ দেয়।’ (সহিহ বুখারি : ৩/৭২)
অস্বাভাবিকতায় ধৈর্য ধারণ
মুসলিম চিকিৎসক রোগীর অসংযত আচরণ ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ধৈর্যের পরিচয় দেবেন; তার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করবেন না।
শায়খ আবু আবদুর রহমান সাকাল্লি (রহ.) বলেন, ‘সব অভিযোগ নিন্দনীয় কিন্তু তিনটি ব্যতিক্রম : শিক্ষার্থী যখন আলেমের কাছে না বোঝার অভিযোগ করে, মুরিদ যখন তার শায়খের কাছে অন্তরের ব্যাধির অভিযোগ করে এবং রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে তার শারীরিক ব্যাধির অভিযোগ করে।’ (আল-মাদখাল লি-ইবনিল হজ : ৪/১৩৪)
অনৈতিকতা ও হারাম পরিহার
মুসলিম চিকিৎসক হারাম কাজ, পদ্ধতি ও প্রতিষেধক পরিহার করবেন যতক্ষণ না রোগীর জীবন বাঁচাতে বিকল্প খুঁজে না পাওয়া যায়।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ রোগ ও আরোগ্য পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক রোগের আরোগ্য রয়েছে; সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। হারাম দ্বারা চিকিৎসা কোরো না।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৪)
সতর্কতা কাম্য সবসময়
মুসলিম চিকিৎসক যেমন রোগীর সেবা করবেন, তেমনি তিনি নিজের ব্যাপারেও সতর্ক থাকবেন। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ওপর তোমার নিজেরও অধিকার রয়েছে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩৬৯)
অন্য হাদিসে তিনি সুস্থ ও অসুস্থের অসাবধান সংমিশ্রণের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের সঙ্গে না রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৭১)
চিকিৎসার সঙ্গে ধর্মসেবা
যেহেতু চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, তাই প্রাজ্ঞ আলেমরা মুসলিম চিকিৎসকদের জন্য তিনটি মৌলিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তা পূরণের ক্ষেত্রে তিনটি কাজ বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। যেন রোগী ক্ষতি থেকে এবং তারা আইনি জবাবদিহি থেকে রক্ষা পান।
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘শারীরিক চিকিৎসার মূল লক্ষ্য বা ভিত্তি তিনটি : সুস্থতা রক্ষা, কষ্টকর বিষয় বা রোগ দূর করা এবং সুস্থতার জন্য হুমকি এমন বিষয় অপসারণ (অস্ত্রোপচার)।’ (জাদুল মাআদ : ৪/৫)
যখন চিকিৎসক দায়ী হবেন
চিকিৎসাকাজের জন্য কোনো চিকিৎসককে দায়ী করতে হলে তার ব্যাপারে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হতে হবে এক. ইসলামি শরিয়ত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলন ও রীতির আলোকে বাড়াবাড়ি করা, দুই. বিকল্প থাকার পরও ক্ষতিকর কোনো ওষুধ বা পদ্ধতি প্রয়োগ করা, তিন. পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবহেলা। (তাকরিবু ফিকহিত তাবিব, পৃষ্ঠা : ১০১)
আর কোনো চিকিৎসক যদি অজ্ঞ হন এবং তার দ্বারা মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে, তবে এমন চিকিৎসককে প্রতিহত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব। (ড. ফায়েক জাওহারি, আখতাউল আতিব্যা, পৃষ্ঠা : ৮)