উচ্চ আদালতে থমকে আছে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার

0

দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা ঘটনা ছিল শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনার দ্রুত ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তখন সরকারপ্রধান এক মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন। এর ধারাবাহিকতায় মাত্র ৫ কার্যদিবসের বিচারে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন, যেখানে মূল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিচারিক আদালতের রায়ের মাত্র দুদিন পরেই মামলার নথি পাঠানো হয় উচ্চ আদালতে। দ্রুত শুনানির লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুকও প্রস্তুত করা হয়। রামিসা হত্যাসহ সংবেদনশীল মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জুন মাসেই হাইকোর্টে গঠন করা হয় একটি বিশেষ বেঞ্চ, যা ইতোমধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২৪টি মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করেছে।

তবে বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও হাইকোর্টে এসে থমকে গেছে রামিসা হত্যা মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া। এখনো শুরু হয়নি এর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি চলছে।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আশা প্রকাশ করে জানান, আগামী ২৫ অক্টোবর ছুটি শেষে হাইকোর্ট খোলার পর চলতি বছরের অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলাটির আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি সম্পন্ন হতে পারে।

অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে কোনো মামলার তদন্ত শেষ করে নিম্ন আদালতে বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রামিসা হত্যা মামলাটি সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই হত্যাকাণ্ডের পরেই তার বাড়িতে সরকারপ্রধান গিয়েছিলেন, পরিবারটিকে আশ্বস্ত করেছিলেন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, যার বাস্তবায়ন হয়েছে।’

তিনি জানান, ‘বিচারিক আদালতে দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর রায়টি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। সেখানেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এরই মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার দুটি জেল আপিলও মঞ্জুর হয়েছে। এমনকি মামলাটি শুনানির তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।’

উচ্চ আদালতে শুনানির ক্ষেত্রে কিছুটা বিরতির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনগতভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ের বিরুদ্ধে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করার যে অধিকার রয়েছে, সেই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার জন্যই আমরা অপেক্ষা করেছি। কারণ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ পক্ষ পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে আপিল দায়েরের যে বিধান, সেই বিধানটা যেন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা গ্রহণ করতে পারেন, এই আইনি অধিকার নিশ্চিত করতেই এই দুই মাস পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।’

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলো শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন। সেই বেঞ্চ গঠন হওয়ার পর হাইকোর্ট পর্যায়ে আমরা জুন মাস থেকে অন্তত ২৪টি মামলা নিষ্পত্তি করেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলা এবং ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলা। রামিসার মামলাটিও ওই কোর্টে শুনানির তালিকাভুক্ত আছে। আশা করছি, ২৫ অক্টোবর আদালত খোলার পর ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সময়কালে আদালতের কার্যকাল চালু থাকবে, সেই সময়ের মধ্যে এই মামলাটি সিরিয়ালে শুনানির জন্য আসতে পারে। সেখানে যদি শুনানি সম্পন্ন হয়, তাহলে ২০২৬ সালের মধ্যেই আপিলের এই প্রক্রিয়াটা নিষ্পন্ন করতে পারব।’

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। চলতি বছরের ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তার ফ্ল্যাটের রুমের ভেতরে নিয়ে যান। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকলে একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে তার জুতা দেখতে পান স্বজনরা।

ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা আসামির কক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান।

আসামি স্বপ্না আক্তারকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তার স্বামী আসামি মো. সোহেল রানা (৩০) হীন কামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করেছে।

এ ঘটনায় ১৯ মে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।

হত্যার আগে ধর্ষণ ও বিভিন্ন স্থানে জখমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের কোনো আবেদন না থাকায় বোঝা যায়, সোহেল স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেছেন। এছাড়া স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না। অপরাধে সহযোগিতা এবং তা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না রাখার বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে
মামলা দায়েরের পর প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একইদিন আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৪ মে সোহেল রানা এবং স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। এরপর চার্জশিটটি আমলে গ্রহণ করে বিচারের জন্য ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। একইদিন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ১ জুন দিন ধার্য করেন।

১ জুন ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। পরদিন একদিনে বাবা, মা, বোন, প্রত্যক্ষদর্শী, সুরতহাল রিপোর্টের সাক্ষী, ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন। ৩ জুন আসামিরা আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান। প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তবে তার স্ত্রী স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

এরপর ৪ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের ফাঁসি ও আসামিপক্ষ আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রার্থনা করেন। ৭ জুন বিচারিক কার্যক্রমের সব আইনি ধাপ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার পর চাঞ্চল্যকর এই হত্যার বিচার ৪ দিনে শেষ করে মাত্র ১৯ দিন পর ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য ৭ জুন তারিখ নির্ধারণ করেন।

গত ৭ জুন আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন আদালত। আসামিদের উপস্থিতিতে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন মৃত্যুদণ্ডের এ রায় ঘোষণা করেন। পাশাপাশি আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে আসামি স্বপ্নাকে দণ্ডের পাশাপাশি দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী পাবেন। ক্ষতিপূরণ না দিলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে তা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গত ৯ জুন মামলাটির পূর্ণাঙ্গ কপিসহ (৬৯ পৃষ্ঠা) ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ডের (ডেথ রেফারেন্স) ৩ পৃষ্ঠাসহ মোট ৭২ পৃষ্ঠার অনুমোদনের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, হত্যার আগে ধর্ষণ ও বিভিন্ন স্থানে জখমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের কোনো আবেদন না থাকায় বোঝা যায়, সোহেল স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেছেন। এছাড়া স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না। অপরাধে সহযোগিতা এবং তা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না রাখার বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।

সূত্র:  ঢাকা পোস্ট

 

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.