চিকিৎসকদের মতে শিশুর জীবনের প্রথম এবং শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ মায়ের বুকের দুধ
একটি শিশুর সুন্দর ও সুস্থ জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় তার মায়ের কোল থেকে। জন্মের পর শিশুর জন্য প্রথম এবং সর্বোত্তম উপহার হলো মায়ের বুকের দুধ। একে কেবল খাবার বললে ভুল হবে, এটি মূলত একটি শিশুর জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ। বিশেষ করে জন্মের পরপরই যে ‘শালদুধ’ নিঃসৃত হয়, তা শিশুর জীবনের প্রথম প্রাকৃতিক টিকা হিসেবে কাজ করে।
চিকিৎসকদের মতে, জন্মের ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের বুকে দিলে তা একদিকে যেমন শিশুকে দ্রুত মায়ের দুধে অভ্যস্ত করে তোলে, অন্যদিকে মায়ের শরীরেও দুধ তৈরিতে দারুণ সাহায্য করে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ থেকে শুরু করে মায়ের নিজের সুস্থতা-সবখানেই মায়ের দুধের উপকারিতা অতুলনীয়।
একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার সবটাই প্রাকৃতিক নিয়মে নিখুঁতভাবে মিশে থাকে মায়ের দুধে। এর উপকারিতা কেবল শারীরিক বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশেও এর ভূমিকা অপরিসীম। যেমন-
*সহজ পরিপাক ও অ্যালার্জি প্রতিরোধ: মায়ের দুধ অত্যন্ত সহজে হজম হয়, যা শিশুর সংবেদনশীল পাকস্থলীর জন্য একদম উপযুক্ত। একই সঙ্গে এটি শিশুকে যেকোনো ধরনের অ্যালার্জির হাত থেকে দূরে রাখে।
*রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্গ: এই দুধে থাকা বিশেষ অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে এক অদৃশ্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ফলে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য বিপজ্জনক সংক্রামক ব্যাধি শিশুকে সহজে কাবু করতে পারে না।
*মেধার অনন্য বিকাশ: এটি প্রমাণিত যে, কৌটার কৃত্রিম দুধ খাওয়া শিশুদের তুলনায় যেসব শিশু মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়, তাদের বুদ্ধিমত্তা বা মেধা প্রায় ৯ গুণ বেশি থাকে।
*আত্মিক বন্ধন ও মানবিক গুণাবলি: মায়ের বুক থেকে দুধ পানের সময় যে ওম ও মমতা শিশু পায়, তা মায়ের সঙ্গে তার এক অবিচ্ছেদ্য আত্মিক বন্ধন তৈরি করে। এই গভীর ভালোবাসা পেয়ে বড় হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে সুন্দর মনের ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তারা অন্য মানুষকেও ভালোবাসতে শেখে।
*শুধু শিশুই নয়, মায়ের জন্যও এক অনন্য আশীর্বাদ
অনেকেই মনে করেন বুকের দুধ কেবল শিশুর জন্যই উপকারী, কিন্তু প্রকৃতির এই নিয়মে মায়ের সুরক্ষাও জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। যেমন-
*আত্মবিশ্বাস ও মানসিক তৃপ্তি: সন্তানকে নিজের বুকের দুধ খাওয়ানো একজন মায়ের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
*ঝামেলাহীন ও প্রাকৃতিক: এর জন্য কোনো বাড়তি প্রস্তুতি, গরম পানি বা কৃত্রিম নিয়মের প্রয়োজন হয় না। যেকোনো অবস্থায়, যেকোনো সময়ে এটি সবসময় প্রস্তুত এবং শতভাগ বিশুদ্ধ।
*দ্রুত শারীরিক সুস্থতা: শিশুর জন্মের পরপরই তাকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে কমে যায়।
*প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণ: শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মনিয়ন্ত্রণের কাজ সম্পন্ন হয়, যা মায়ের শরীরকে দ্রুত ধকল কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
*মরণব্যাধি থেকে সুরক্ষা: যেসব মায়েরা সন্তানকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান, তাদের জরায়ু ও স্তন ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
মায়ের বুকের দুধ সত্যিকার অর্থেই শিশুর জীবনের ভিত্তি এবং এক সুন্দর শুভসূচনা। একটি শিশু যখন সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে, তখনই একটি সুস্থ সমাজ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে। তাই মায়ের দুধ পানের এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে কেবল মায়ের একার প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। পরিবারের প্রতিটি সদস্য এবং সমাজের সবাইকে যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সহযোগিতা করা এবং তাকে প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র: ভেরি ওয়েল হেলথ