মমতার দুর্গে বিজেপির উত্থানের নেপথ্যে ৫ ‘ম’
১৫ বছরেরও বেশি সময় আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মা, মাটি, মানুষ’— এই তিন ‘ম’-এর শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। সেই স্লোগানই পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের টানা তিনটি নির্বাচনী জয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তবে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার সেই ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। নতুন করে পাঁচটি ‘ম’—মুসলিম, মহিলা, অভিবাসী (মাইগ্র্যান্ট), মতুয়া সম্প্রদায় এবং ভারতীয় জনতা পার্টির শক্তিশালী নির্বাচনি যন্ত্র (মেশিনারি)—মমতার জয়ের ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বাংলার রাজনীতিতে ৫ ‘ম’
মহিলা ভোটার
দীর্ঘদিন ধরেই নারী ভোটাররা তৃণমূলের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। গত এক দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারীদের জন্য একাধিক কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছেন—যেমন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নগদ সহায়তা প্রকল্প এবং ‘কন্যাশ্রী’।
তবে ২০২৬ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিও নারীদের কেন্দ্র করে নানা প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালায়। আরজি কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাও বড় ইস্যু হয়ে ওঠে, যেখানে নারী সুরক্ষা নিয়ে তৃণমূলকে নিশানা করে বিজেপি। এমনকি পানিহাটি আসন থেকে ওই ঘটনার শিকার নারীর মাকেও প্রার্থী করা হয়।
মুসলিম ভোট
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২১ সালে মুসলিম-প্রধান আসনগুলোতে তৃণমূলের বড় জয়ের পেছনে সংখ্যালঘু ভোটের একত্রীকরণ বড় কারণ ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে ভোটের ধরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। উন্নয়ন, ভোটার তালিকা ও প্রশাসন নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন জানাচ্ছে। তৃণমূলের পাশাপাশি কংগ্রেস পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করছে, আর অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন সম্ভাব্য ‘ভোট কাটার’ শক্তি হিসেবে উঠে আসছে।
অভিবাসী ভোটার
এই নির্বাচনে অভিবাসী ভোটাররা ছিল অনিশ্চিত একটি বড় ফ্যাক্টর। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় বহু পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যে ফিরে এসেছেন। ফলে ভোটের ফলাফল আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
মতুয়া সম্প্রদায়
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১৭ শতাংশ তফসিলি জাতিভুক্ত মতুয়া সম্প্রদায় বিজেপির উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই সম্প্রদায়ের সমর্থন এবারের নির্বাচনে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র
এবারের নির্বাচনে বিজেপি কেন্দ্র ও রাজ্য নেতৃত্বের সমন্বয়, বুথ স্তরের সংগঠন, ডিজিটাল প্রচার এবং সংগঠন বিস্তারের উপর জোর দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহ্যগতভাবে ‘ক্যাডার-ভিত্তিক’ রাজনীতি (বাম থেকে তৃণমূল) দ্বারা পরিচালিত হওয়ায়, বিজেপি তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের সংগঠনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করছে—এবং সেটিই তাদের উন্নত ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি