বঞ্চিত

0

গতবারের চেয়েও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এবার ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কমিয়ে মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার। তবুও সারা দেশেই নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে বিক্রি হয়েছে চামড়া। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রপ্তানিরও ঘোষণা দেয়া হয়। এর পরেও বিপর্যয় ঠেকানো যায়নি। রাজধানীতে গরুর চামড়া আকারভেদে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২-১০ টাকায়। এ ছাড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা, পানিতে ভাসিয়ে দেয়া ও রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হয়েছে, যা নজিরবিহীন উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতবারের বিরূপ অভিজ্ঞতায় এবার মহামারির মধ্যে চাহিদা কম থাকবে ধরে নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল ফড়িয়ারা। পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের কয়েকশ’ কোটি টাকা পাওনা বকেয়া পড়ে থাকা এবং মহামারিকালে বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া চামড়ার দরপতনে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার নির্ধারিত দাম বেঁধে দিলেও বাস্তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর চেয়ে অনেক কম দামেই বেচাকেনা হয়েছে।

শনিবার ঈদের দিন ও রোববার ঈদের দ্বিতীয় দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে দুইশ’ টাকায়, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এক বছর আগেও এসব চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় হাতবদল হয়েছে। এবার যতো বড় চামড়াই হোক কোনো কোরবানিদাতা কিংবা সংগ্রহকারী ৬০০ টাকার বেশি দাম পাননি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঈদের আগে চামড়াশিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ধরা হয়েছে। আর ঢাকার বাইরে ধরা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা। অর্থাৎ আড়তদাররা মাঝারি মানের (২২ ফুট আয়তন) একটি চামড়া ট্যানারিতে বিক্রি করবেন ৭৭০ টাকা থেকে ৮৮০ টাকায়। গত বছর এসব চামড়া বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকায়। এই বছর একই মানের চামড়াই কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে কেনা হয়েছে গড়ে ৩০০/৪০০ টাকা দরে। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া গত বছরের প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৩ থেকে ১৫ টাকা করা হয়। আবার দরপতন ঠেকাতে ২৯শে জুলাই কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

দরপতনের সুযোগে দালাল, ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার এমনকি এই খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ট্যানারিগুলোর মুনাফা বাড়ার পথ উন্মুক্ত হলেও কেউ দায় নিতে রাজি নয়। দেশে চামড়ার চাহিদার বেশির ভাগ অংশই পূরণ হয় কোরবানির ঈদে জবাই হওয়া পশু থেকে। এবার ৭০ লাখ গরু জবাই হবে বলে ধারণা করা হলেও হয়েছে ৫০ লাখের মতো বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছাগল ২০ লাখ জবাই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফড়িয়ারা উধাও
কোরবানির চামড়া তিন হাত হয়ে ট্যানারিতে পৌঁছে। কোরবানিদাতার কাছ থেকে তা কিনে নেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, যাদের ফড়িয়া বলা হয়। তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কেনেন আড়তদাররা। সেই চামড়া লবণ মাখিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর বিক্রি করা হয় ট্যানারিতে, যেখানে তৈরি হয় চামড়াজাত নানা পণ্য। গত বছর ফড়িয়ারা যে দরে চামড়া কিনেছিলেন, বিক্রি করতে গিয়ে লাভ তো দূরের কথা কেনার দামও পাননি। তখন অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলেন কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছিলেন। এবার করোনাভাইরাস মহামারিতে চামড়ার সরকারি দরও কমে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ হারান। ফলে অনেক স্থানে কোরবানির চামড়ার ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছিল না।

পুরান ঢাকার পোস্তায় দেখা গেছে, সারি সারি পিকআপ ও ট্রাকে করে কোরবানির পশুর চামড়া আড়তে আসছে। দরদাম করে কিনছেন আড়তদাররা। সেই চামড়া আড়তের ভেতরে নিয়ে লবণ দিয়ে সংরক্ষণে ব্যস্ত শ্রমিকেরা।
পোস্তায় ঢোকার মুখে সড়কের পাশে বসে শফিকুর রহমান চামড়া কিনছিলেন। তিনি বলেন, বড় গরুর চামড়া ৫০০-৬০০ ও মাঝারি গরুর চামড়া ৩০০-৩৫০ টাকায় কিনেছেন। আর ৪ পিস ছাগলের চামড়া কিনেছেন ১০ টাকায়। দামের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘মোটামুটি কমই।’

বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪০০-৫০০ টাকায় গরুর চামড়া কিনে পিকআপে করে পোস্তায় নিয়ে যাচ্ছিলেন হাজী শের মোহাম্মদ। তিনি বলেন, বড় গরুর চামড়া ৪০০-৬০০ টাকায় এবং ছোট ও মাঝারি গরুর চামড়া ১৫০-২৫০ টাকায় কিনেছেন।

পোস্তার আবদুল মাজেদ আড়তে কমিশন এজেন্ট মো. নয়ন ও তাজউদ্দীন জানালেন, করোনার কারণে কোরবানির পরিমাণ অনেক কম হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে চামড়ার যে পরিমাণ আমদানি তাতে মনে হচ্ছে, ঢাকায় গতবারের চেয়ে বড়জোর ৫ শতাংশ কম কোরবানি হয়েছে।

বড় আকারের গরুর চামড়া গড়ে ৩৫-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া গড়ে ২৫-৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া গড়ে ১৬-২০ বর্গফুটের হয়। তাতে সরকারের নির্ধারিত দাম হিসাব করলে বড় চামড়া কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা, মাঝারি চামড়া হাজার টাকা ও ছোট চামড়ার দাম হয় কমপক্ষে ৬০০ টাকা। তার থেকে প্রক্রিয়াজাত, শ্রমিকের মজুরি ও আড়তদারের মুনাফা বাদ দিলেও যা দাঁড়ায় তার কাছাকাছি দামেও চামড়া বিক্রি হয়নি।

কম দামের কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব খান বলেন, কাঁচা চামড়া যে দামে বিক্রি হচ্ছে তা ঠিকই আছে। কারণ প্রতি বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে ৮ টাকা খরচ হয়। তাছাড়া আড়তদারেরা নগদ অর্থের সংকটে আছেন। বেশির ভাগ ট্যানারির মালিক আড়তদারদের বকেয়া পরিশোধ করেননি। বেশি দিয়ে কিনতে গেলে সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী আড়তের লভ্যাংশ থাকে না। এখন কেউ যদি মাঠ পর্যায়ে ৩০০/৪০০ টাকায় চামড়া কেনে, সেটা ভিন্ন হিসাব। দেখা গেছে ৩০০ টাকায় কিনে অনেকে আড়তে ৬০০ টাকা করে বিক্রি করছেন, অর্থাৎ অতি মুনাফা করছেন।

বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ছোট চামড়াই বেশি এসেছে এবার। চামড়া প্রক্রিয়াজাতে লবণের খরচ আছে। কাটিংয়েও বাদ যাবে কিছু চামড়া। তা ছাড়া শেষ পর্যন্ত কী দাম পাওয়া যাবে, তা নিয়ে আশঙ্কায় আছেন অনেক ব্যবসায়ী।

আড়তদারদের বকেয়ার বিষয়ে সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই ট্যানারির মালিকেরা আর্থিক সংকটে আছেন। সে জন্য আড়তদারদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না অনেকে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ট্যানারিগুলোতে অর্ধেকের বেশি চামড়া এখনো পড়ে আছে। উল্টো নতুন করে চামড়া কেনা সমস্যা হচ্ছে।
গত বছর ঈদুল আজহায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চামড়ার অস্থায়ী বাজারে ছোট গরুর একেকটি চামড়া ৩০০-৪০০ টাকা, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ৫০০-৬০০ এবং বড় চামড়া হাজার টাকায় বিক্রি হয়। রাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। ২৫০-৩০০ টাকার বেশি কোনো চামড়া বিক্রি হয়নি। পরদিন পোস্তায় ১৫০-২০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করতেও কষ্ট হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ঢাকার বাইরে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে চামড়া সড়কে ফেলে দেয়া ও পুঁতে দেয়ার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com