কী আছে ট্রাম্প-ডেনমার্ক চুক্তিতে?

0

গ্রিনল্যান্ড দখল বা অধিগ্রহণ নিয়ে কয়েক মাসের টানাপোড়েনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক দ্বীপটির নিরাপত্তা বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পাবে। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চুক্তিটি তাদের সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।

ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে বলেন, চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার ‘স্থায়ী’ সক্ষমতা পাবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তার দাবি, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারবে না এবং সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও মার্কিন অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা। তবে কার্যকর হওয়ার আগে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ফ্রেডেরিকসেনের ভাষ্য, এই চুক্তি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে যৌথ নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং একই সঙ্গে ডেনমার্ক রাজ্যের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেনও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, এটি গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় দ্বীপটির স্বার্থ ও অবস্থানকে স্বীকৃতি দেবে।

কী আছে চুক্তিতে?

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত নথি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক ঘাঁটি, প্রবেশাধিকার ও আকাশপথ ব্যবহারের অধিকার আরও স্থায়ী ভিত্তিতে নিশ্চিত করার বিষয়টি চুক্তির কাঠামোর অংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হলেও কার্যকর থাকবে—এমন ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ দ্বীপটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতে পরিবর্তন এলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামরিক-সংক্রান্ত অধিকার অব্যাহত রাখার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ন্যাটোর বাইরের কোনো দেশকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বা সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত খাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিনিয়োগ সীমিত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের মতো দেশকে কেন্দ্র করে এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পরিধি যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বক্তব্যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সতর্ক ভাষায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করছে না এবং দ্বীপটির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ডেনমার্কের কাছেই থাকছে।

কেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এত আগ্রহ ট্রাম্পের?

গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে এর ভৌগোলিক অবস্থান, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যবর্তী কৌশলগত গুরুত্ব এবং বিপুল খনিজসম্পদ—সব মিলিয়ে দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে।

বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজের মজুত রয়েছে, যার অনেকগুলো এখনো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা হয়নি। মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি তৈরিতে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ।

এই কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণেই ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলে আসছেন। এমনকি দ্বীপটি দখলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। এসব মন্তব্য ডেনমার্ক ও অন্যান্য ন্যাটো মিত্রের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

১৯৫১ সালের চুক্তির সঙ্গে সম্পর্ক

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৫১ সালে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পিটুফিক স্পেস বেসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

নতুন চুক্তি ওই পুরোনো কাঠামোর ওপর কতটা পরিবর্তন আনছে, তা পুরো নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। তবে নতুন ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, এটি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের স্থায়ী সমাধান করেছে। অন্যদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, চুক্তির আওতায় তাদের সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বহাল থাকবে।

চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর ও প্রয়োজনীয় সংসদীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই কার্যকর হবে। ফলে এর সুনির্দিষ্ট শর্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রকৃত পরিধি পুরোপুরি বোঝার জন্য চূড়ান্ত নথি প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.