শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শেয়ার মার্কেটের ধারাবাহিক পতন ঘটিয়ে হাজারো বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করার জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২১তম দিন লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদের বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন।
খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর পক্ষে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের শেয়ার মার্কেটের ধারাবাহিক পতনের প্রধান কারণগুলো কী কী ছিল, শেয়ার মার্কেটের ধারাবাহিক পতন ঘটিয়ে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করার জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির অভিযোগ দুদকের মাধ্যমে অনুসন্ধান ও কতিপয় ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে মামলাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে আরও অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কিনা তা উদঘাটনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের শেয়ার বাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ উদঘাটনে বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। পরিচালিত কার্যক্রমে শেয়ার বাজারের ধারাবাহিক পতনের পেছনে নিম্নোক্ত কারণগুলো সক্রিয় ছিল।
তিনি বলেন, বাজার কারসাজি ও কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, কিছু কোম্পানির আইপিও, বন্ড ও অন্যান্য ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বল তদারকি এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া, কর্পোরেট সুশাসনের ঘাটতি ও আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং বাজারে আস্থার সংকট, নীতিগত অসঙ্গতি ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও পুঁজিবাজার বান্ধব করনীতির অভাব ইত্যাদি কারণ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ার মার্কেট কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এক হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া দায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণে গঠিত তদন্ত কমিটির গঠন ও প্রদত্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার শেয়ার মার্কেটের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাসহ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য বন্ধপরিকর। সরকার ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসার ইত্যাদির মাধ্যমে উন্নত ও টেকসই পুঁজিবাজার গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অগ্রাধিকার অনুসারে কর্মসূচি
১. বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার ৪ জুন পুঁজিবাজার বিষয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনার-কে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে নিয়োগ প্রদান করেছে।
২. নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাজারে বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছে।
৩. লাভজনক সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিসমূহের শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণে উদ্বুদ্ধ করা। এছাড়াও, বহুজাতিক কোম্পানিসহ উচ্চ মূলধনসম্পন্ন কোম্পানিসমূহের শেয়ারও স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৪. এসএমই কোম্পানিসহ ভাল মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিসমূহকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা।
৫. পুঁজিবাজার কারসাজি বন্ধে অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও প্রদানকারীর (হুইসেলব্লোয়ার) প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও উৎসাহ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬. তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের হিসাব নিরীক্ষা, উপর্যুক্ত অডিটরের মাধ্যমে নিরীক্ষার নিমিত্ত এনলিস্টমেন্ট অব প্যানেল অব অডিটরস অ্যান্ড অডিট ফার্মস নীতিমালা প্রণয়ন করা।
৭. ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট (এফপিআই) অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান সংস্কার, ওয়ান স্টপ সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান সার্ভিস চালু, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স হ্রাসকরণ, লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর বাতিল এবং বিও অ্যাকাউন্ট খোলা ও মূলধন প্রত্যাবসান প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা।
৮. পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়ের সংক্রান্ত বিধান সিকিউরিটিজ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা।
৯. পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা।
১০. পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কেট ও পণ্য উভয়ই সম্প্রসারিত করা।
১১. ই-কেওয়াইসি-এর মাধ্যমে অনলাইন ও মোবাইল ভিত্তিক বিও হিসাব খোলা ও ট্রেডিং সুবিধা চালু করা।
১২. বিনিয়োগবান্ধব ও যুক্তিসঙ্গত করনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া।
১৩. ব্যাংক ও এমএফএসের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা প্রদান করা।
১৪. এআইভিত্তিক শক্তিশালী নজরদারির মাধ্যমে বাজারের অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রাখা।
১৫. তালিকাভুক্ত ইস্যুয়ার কোম্পানিসমূহে সুশাসন জোরদারকরণে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে অর্জিত সুদ আয়ের অংশ বিশেষ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে জমা করার বিধান প্রণয়ন করা।
১৬. আইনকানুন যুগোপযোগী করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ আরও সুরক্ষিত করা।
১৭. সরকারি সিকিউরিটিজসমূহের (ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুক) লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নিষ্পন্ন করার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি।