দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা!

0

সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এটি এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়। আজ বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য দুটি মনোনয়ন ফরম কেনা এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কর্নেল অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণার পর বিষয়টি নতুন করে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। তারা এ নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করেছে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই মুহূর্তে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি। তাই দলটির মনোনীত প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কে হচ্ছেন তা নিয়েও নানামুখী আলোচনা আছে। দলীয় পরিসরে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় কয়েকটি নাম ঘুরেফিরে আসছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে বিএনপির মহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নাম। কয়েকটি গণমাধ্যমে তাকেই নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ধরে নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। আজ রোববার তারা দুটি মনোনয়নপত্র কিনেছে। এতে জল্পনা আরও বেড়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে এবং বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং আরেকজন সংসদ সদস্য সমর্থক হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করবেন। যাচাই-বাছাই শেষে যদি একজনই বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। আর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আমাদের দেশে মোটামুটি একটা আনুষ্ঠানিকতাই। বিগত সংসদগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত ব্যক্তিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের সংসদে কেবল ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাকি সংসদগুলোতে রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেহেতু ক্ষমতাসীন দল বিএনপির হাতে, তাই তাদের মনোনীত ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে সবার নজর এখন বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন পর্যন্ত বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম বিভিন্ন মহলে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। পাশাপাশি ড. আবদুল মঈন খান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং নজরুল ইসলাম খানের নামও আলোচনায় এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘মনোনয়ন ঘোষণার দিনই কার্যত দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন সেটি স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

আলোচনায় আছেন যারা

১. খন্দকার মোশাররফ হোসেন : অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে এগিয়ে?

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং সাবেক মন্ত্রী হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তার বড় শক্তি। ১৯৯১ সালে তিনি জ্বালানিমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

রাষ্ট্রপতি পদে তার সম্ভাব্যতা নিয়ে যারা আলোচনা করছেন তারা বলছেন, তিনি দলের প্রবীণ নেতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে তার অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার বয়স ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও রাষ্ট্রপতির মতো মর্যাদাপূর্ণ সাংবিধানিক পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

২. মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বেশি

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতৃত্বে থাকা, বিরোধী দলে থাকতে রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতা তার অন্যতম শক্তি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে দলীয় রাজনীতির বাইরে সাধারণ মানুষের কাছেও তুলনামূলক গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সেই বিবেচনায় মির্জা ফখরুলের নাম বেশি আসছে।

তবে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তার অবস্থানও বড় বিষয়। দল তাকে রাষ্ট্রপতি পদে পাঠালে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে—এমন রাজনৈতিক হিসাবও সামনে আসতে পারে।

৩. ড. আবদুল মঈন খান : বুদ্ধিবৃত্তিক ও কূটনৈতিক পরিচিতি ভালো

ড. আবদুল মঈন খান বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য। সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তার দীর্ঘদিনের কাজ তাকে অন্যদের তুলনায় কিছুটা আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে আসার ক্ষেত্রে তার সম্ভাবনা যারা দেখছেন তারা বলছেন, তার শিক্ষাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ ভালো। একটি তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে চাইলে তার মতো প্রার্থী বিবেচনায় আসতে পারেন।

৪. নজরুল ইসলাম খান : দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা

নজরুল ইসলাম খান বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং দলের কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাকে আলাদা অবস্থান দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে তার নামও সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।

তার বড় শক্তি হলো– তিনি দলের প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতা। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে পরিমিত অবস্থান তাকে একটি সম্ভাব্য ‘সমঝোতার প্রার্থী’ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তির কারণে বিএনপির এসব জ্যেষ্ঠ নেতাদের নাম বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হচ্ছে। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি এমন একজনকে বেছে নিতে পারে, যিনি একদিকে দলের প্রতি আস্থাশীল থাকবেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম। বিশেষ করে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষায় অভিজ্ঞ ও পরিমিত ব্যক্তিত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক মহলে আরেকটি আলোচনা আছে, সেটি হলো– বিএনপি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো চমকও দেখাতে পারে। অতীতেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রার্থীর নাম গোপন রাখার নজির রয়েছে। সে কারণে আলোচনায় থাকা পরিচিত নামের বাইরে সম্পূর্ণ নতুন কাউকেও মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষমতাসীন দলের হাতে থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা নেই। বরং মূল প্রশ্ন এখন– দলটি কাকে মনোনয়ন দিচ্ছে এবং সেই মনোনয়নের মাধ্যমে কী ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে। এখন পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলের দিকে। তাদের ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন সবাই।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.