‘জামিনবিরোধী’ খায়রুল হক এখন জামিনে

0

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে থাকার সময় যিনি ঢালাও আগাম জামিন দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং এ সংক্রান্ত কঠোর আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি পটপরিবর্তনে সেই সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক নিজেই এখন আদালতের কাঠগড়ায়, নিচ্ছেন জামিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আইনের শাসন’ এবং ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’—এ দুটি বিষয় তার ক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে যেন নিয়তির নির্মম পরিহাসে!

বিগত দিনের তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বিচারপতি থাকাকালীন ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার অধীনে আগাম জামিন (অ্যান্টিসিপেটরি বেইল) এবং সাধারণ জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের ঢালাও আদেশের প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু কড়া পর্যবেক্ষণ ও নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।

তিনি তার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ঢালাওভাবে আগাম জামিন দেওয়ার প্রবণতা তদন্ত সংস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সমাজের বৃহত্তর নিরাপত্তার স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে আগাম জামিনের সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান (যেমন ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৮ ধারার মতো) বাংলাদেশের আইনে স্পষ্টভাবে না থাকার পরও উচ্চ আদালত যেভাবে প্রতিনিয়ত আগাম জামিন দিচ্ছে, তাকে তিনি অনেক ক্ষেত্রে ‘বিচারিক আতিশয্য’ (জুডিশিয়াল এক্সট্রাভ্যাগানজা) বা রেওয়াজের অপব্যবহার হিসেবে গণ্য করতেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪৯৭ ও ৪৯৮ সংক্রান্ত বিভিন্ন লিভ টু আপিল নিষ্পত্তির সময় তার দেওয়া মৌখিক পর্যবেক্ষণ এবং সংক্ষিপ্ত আদেশগুলোতে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হতো।

বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের জামিনের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নানাবিধ অনিয়মের গুরুতর অভিযোগের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেশের গণতন্ত্র তথা নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করার মতো সবচেয়ে বড় অভিযোগ তো রয়েছেই।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি এমপি বলেন, বর্তমানে বিচার বিভাগ যে স্বাধীন এবং কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই—খায়রুল হকের জামিন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যখন প্রায় সব মহলে গ্রহণযোগ্য ছিল, তখন তিনি রাজনৈতিক মোটিভ নিয়ে তা বাতিল করে দেশের গণতন্ত্র তথা নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিলেন।

সেই রায়টা নিয়েও তিনি দুর্নীতি বা প্রতারণা করেছেন বলা যায়, কারণ ওপেন কোর্টে যে রায় দিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন পর পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেটি পরিবর্তন করা হয়েছিল।

অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি আরও বলেন, বিচারপতি খায়রুল হকের মামলাটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে, বিচারিক আসনে বসে যারা সংবিধান লঙ্ঘন করেন বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রায় পরিবর্তন করেন, ইতিহাস ও আইন কাউকেই ক্ষমা করে না। যিনি একসময় মানুষের জামিন পাওয়ার পথকে কঠিন করেছিলেন, আজ নিজের স্বাধীনতা রক্ষায় তাকে সেই আদালতের বারান্দায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

তবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী এবং বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খায়রুল হকের কারণে জামিনের হকদার হওয়া সত্ত্বেও ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়া হয়নি। খায়রুল হক ম্যাডামকে জোর করে বের করে দিয়েছিলেন। তার কারণে এ দেশে দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী ব্যবস্থা স্থায়ী হয়েছে। তিনি উৎকোচ নিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছেন। যে কারণে দীর্ঘদিন এ দেশের মানুষ স্বৈরাচারের হাতে নিষ্পেষিত হয়েছিল।

মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, যার কারণে এ দেশে স্বৈরাচার জন্ম হয়েছিল, সেরকম একটি লোক জামিনে মুক্তি পাবে, তাহলে জেলখানায় তো আর কোনো চোর-ডাকাতই বোধহয় রাখা উচিত না! তার মতো ডাকাত যদি জামিন পায় তাহলে জেলখানায় থাকা সকল চোর-ডাকাত জামিন পাওয়ার হকদার। আমি মনে করি, তার জামিনের বিষয়টি আবার নতুন করে ভাবা উচিত।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, অতীতে যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি জনপ্রিয় সরকার ব্যবস্থাকে কলমের খোচায় বাতিল করেছেন, আজ তাকে নিম্ন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জামিন প্রার্থনা করতে হচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতিকে এ ধরনের পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। একসময় তিনি নিজেই জামিনের বিরোধিতা করেছিলেন, এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতে তিনিও জামিন পাচ্ছেন।

অ্যাডভোকেট রাজ্জাকী আরও বলেন, বিচারকের আসনে বসে যখন রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতিত্ব করা হয়, তখন তাদের জন্য ন্যাচারাল জাস্টিস (প্রকৃতির বিচার) নেমে আসে। মানুষ যখন সিস্টেমের কাছে অসহায় হয়ে যায়, সবাই যখন জিম্মি হয়ে যায়, তখন আল্লাহর তরফ থেকে একটা জাজমেন্ট আসে। আমার প্রত্যাশা, এই প্রকৃতির বিচার থেকে এখন যারা ক্ষমতাসীন আছেন তারাও শিক্ষা নেবেন।

সূত্র: বাংলানিউজ

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.