বেসরকারি খাত বাঁচলেই ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি
পরিবেশ রক্ষা করলে যেমন মানুষ বাঁচে, সুন্দরবন যেমন ঘূর্ণিঝড় কিংবা সাইক্লোন থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে; ঠিক তেমনই আমাদের অর্থনীতির লাইফলাইন হলো বেসরকারি খাত। বেসরকারি খাত যত বিকশিত হয় একটি দেশের অর্থনীতি ততই শক্তিশালী হয়।
পরিবেশ রক্ষা না করলে যেমন আমাদের জীবন বিপন্ন হয়, তেমন বেসরকারি খাত মুখ থুবড়ে পড়লে গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত হতে বাধ্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়মই এটি।
২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট এবং মহামন্দার পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ধস থেকে বাঁচাতে বারাক ওবামা বেশ কিছু আগ্রাসি ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা ‘ওবামানোমিকস’ (Obamanomics) নামেও পরিচিত। ওবামা দায়িত্ব নিয়েই আমেরিকান রিকভারি অ্যান্ড রিইনভেস্টমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৯ (ARRA) জারি করেছিলেন।
এটি ছিল প্রায় ৭৮৭ বিলিয়ন ডলারের একটি উদ্দীপনা প্যাকেজ (Stimulus Package)। এর আওতায় বেসরকারি খাতের জন্য বড় অঙ্কের করছাড় দেওয়া হয়েছিল।
বেকারভাতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে সরকারি বিনিয়োগ করা হয় যার ফলে সরাসরি উপকৃত হন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। বারাক ওবামা অটো ইন্ডাস্ট্রি বেলআউট (Auto Industry Bailout) কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া থেকে মার্কিন গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে (যেমন জেনারেল মোটরস ও ক্রাইসলার) বাঁচাতে তিনি সরকারি অর্থায়ন বা বেলআউট প্যাকেজ প্রদান করেন, যা হাজার হাজার কর্মসংস্থান রক্ষা করেছিল। অর্থাৎ বেসরকারি খাত বাঁচিয়ে তিনি তীব্র অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছিলেন। যুক্তরাজ্যের সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক কভিডের সময় অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে বেসরকারি খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিয়েছিলেন। ফলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। এ পদক্ষেপ তাকে এতটাই জনপ্রিয় করেছিল যে পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী সব দেশই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি খাতকে সুরক্ষিত রাখতে চায়। বেসরকারি খাতে প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করা হয়।
বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। ইউনূস সরকারের দেড় বছরের অপশাসন এবং দুর্নীতি, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকট বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সারা দেশে শুরু হয়েছে অসহনীয় লোডশেডিং, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে জিনিসপত্র। ডিজেল সংকটের কারণে বোরো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আইএমএফসহ দাতারা ঋণের বিপরীতে কঠিন শর্ত আরোপ করে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এর মধ্যেই আগামী ১১ জুন বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেট ঘোষণা করবে। একদিকে বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকার, অন্যদিকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট-এ পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে বিএনপি সরকার?
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের সহযোগিতা করেই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো বেসরকারি খাত। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৯৩ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে হয়। কিন্তু বেসরকারি খাত যেন সব সময়ই অবহেলিত। তাদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হয় না। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখলে বাংলাদেশে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা করা কঠিনই শুধু নয়, অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে শিল্প বাঁচাতে, ব্যবসা সচল রাখতে ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এটাই যেন পরবর্তীকালে তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার বদল হলেই তারা নতুন সরকারের বিরাগভাজন হয়ে যান। তাদের ব্যবসাবাণিজ্যে সৃষ্টি করা হয় নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এতে ওই ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তার যত না ক্ষতি হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দেশের অর্থনীতির। এ ধারার অবসান হওয়া দরকার সবার আগে। বিনিয়োগকারীদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। একজন উদ্যোক্তার রাজনৈতিক পছন্দ থাকতেই পারে, কিন্তু সেজন্য যেন কোনো অবস্থাতেই তাকে বৈষম্যের শিকার হতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা সরকারের দায়িত্ব। কারণ একজন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তার প্রতিষ্ঠান চালাতে না পারেন, তাহলে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি আয় কমে, কমে সরকারের রাজস্ব। তাই একজন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা যে মতের হোন না কেন, তিনি যদি সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত না হন তাহলে তার বিরুদ্ধে বিমাতাসুলভ আচরণ করা উচিত নয়। সরকারে যারাই আসুক, বেসরকারি খাত যেন তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনই গণতন্ত্র ছাড়া বেসরকারি খাত অচল হয়ে যায়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো গণতন্ত্র।’
অনির্বাচিত সরকার কীভাবে বেসরকারি খাত ধ্বংস করে বিশ্বে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্ভবত বাংলাদেশ। বাংলাদেশে দুটি অনির্বাচিত সরকার শুধু বেসরকারি খাতের ক্ষতিই করেনি, দেশের অর্থনীতি পিছিয়ে দিয়েছে বহু বছর। ২০০৭ সালের এক-এগারো সরকার এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি খাত ধ্বংসের জন্য দায়ী। ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এক-এগারোর সরকার যেভাবে বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্য ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছিল, একই পথ অনুসরণ করে ইউনূস সরকার। ইউনূস সরকারের সময় হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মব সন্ত্রাস করে বহু কলকারখানা লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। লাখ লাখ শ্রমিক মুহূর্তেই বেকার হয়ে যায়।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলাসহ অসংখ্য হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে তাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলা হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তারা কাজকর্ম বন্ধ করে দেন। এ সময় তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বহু প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে রাখা হয় দিনের পর দিন। অর্থ পাচারের অসত্য গল্প বানিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করা হয় বহু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ১১ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের কল্পিত অভিযোগ এনে নজিরবিহীন হয়রানি। ইউনূস সরকারের দেড় বছরে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়িয়ে বিনিয়োগের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিলেন ইউনূস সরকারের নিযুক্ত গভর্নর। বাংলাদেশকে দেউলিয়া বানিয়ে বিদেশি দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করাই যেন ছিল ইউনূস সরকারের মূল উদ্দেশ্য। তাই বিএনপি পেয়েছে ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র, যেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তারা হয়েছিলেন মৃতপ্রায়। তাই এ পরিস্থিতি থেকে চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের আশু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে :
১. অবিলম্বে বন্ধ কলকারখানা খুলে দেওয়া। আসন্ন বাজেটে এ বিষয়ে বেলআউট প্যাকেজ ঘোষণা করা যেতে পারে।
২. অবিলম্বে ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা। এতে তারা উৎপাদন ও বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। আশার কথা, ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সরকার এটা যত দ্রুত বাস্তবায়ন করবে তত দ্রুত বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরে আসবে।
৩. ব্যবসায়ীদের জব্দ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া এবং অন্যান্য বাধা দূর করা। নিরপেক্ষ এবং যৌক্তিক তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৪. বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে দেশি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ব্যবসায়ীরা যেন বিদেশে থেকে ইকুইটি পার্টনার আনতে পারেন সেজন্য সরকারের সহযোগিতা দরকার। এতে করে বিদেশি বিনিয়োগ আনা সহজ হবে। প্রাইভেট-প্রাইভেট পার্টনারশিপকে উৎসাহিত করা দরকার।
৫. আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিদেশি ব?্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ ঋণ গ্রহণের নীতিমালা সহজ করা হলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা সম্ভব।
৬. অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দলমতনির্বিশেষে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে সরকারের নিয়মিত বৈঠকের সংস্কৃতি চালু করা প্রয়োজন।
৭. বিনিয়োগসংক্রান্ত আইনগুলো দ্রুত হালনাগাদ এবং আধুনিকায়ন করা জরুরি। এতে বহু উদ্যোক্তা নতুন নতুন শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসবেন।
৮. বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও গতিশীল এবং বেসরকারি খাতবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
৯. বিচার বিভাগ, আয়কর ও রাজস্ব বিভাগকে আরও গতিশীল ও জনবান্ধব করতে হবে। বছরের পর বছর রাজস্ব ও ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান যেন হয়রানি না করে সেজন্য সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
১০. আবাসন খাতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারলে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে নিজের বাড়ির মালিক হতে পারবেন।
১১. সুশাসন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
১২. গণতন্ত্রের বিকল্প নেই। তাই যেকোনো মূল্যে গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি যেন সুযোগ না পায় সেজন্য সরকার ও বিরোধী দলের ভারসাম্যমূলক আচরণ জরুরি। উভয়েই যেন মৌলিক অর্থনৈতিক বিষয়ে এবং দেশের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে পারে সেই চর্চা চালু করা প্রয়োজন। সামনে কঠিন সময়। সবাইকে তাই কৃচ্ছ্রতা অবলম্বন করতে হবে। তবে জনগণ যদি বোঝে সরকার তাদের কষ্ট লাঘবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, তাহলে জনগণও পাশে দাঁড়াবে। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। যেখানে বেসরকারি খাতের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন