পাকিস্তানে মার্কিন সফর: ইতিহাস, কূটনীতি ও নাটকীয় মুহূর্ত
একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। যে সংলাপ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে।
তাই সবার নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে। আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা, যাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
আলোচনা ঘিরে ইসলামাবাদে জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট, মোতায়েন করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী এবং সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য এটি কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
কারণ প্রায় এক দশক পর কোনো উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করছে।
অতীতে পাকিস্তানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টদের সফরের ইতিহাস—
করাচি যখন সুগন্ধে ভরে উঠেছিল
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের আমন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪তম প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরের এক শীতল সকালে করাচিতে অবতরণ করেন।
তারা পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত কৌশল, পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক, সেন্টো জোট এবং পাকিস্তানের সামরিক প্রয়োজনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন।
শহরজুড়ে তখন সাজসজ্জা—বাড়িঘর পরিষ্কার, আলোকসজ্জা, রাস্তা সংস্কার, এমনকি একটি বিশাল মিউজিক্যাল ফোয়ারাও তৈরি করা হয়েছিল।
করাচির দরিদ্র এলাকায় থাকা দুর্গন্ধ ঢাকতে প্যারিস থেকে সুগন্ধি এনে রাস্তার পাশে ছিটানো হয়েছিল, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অস্বস্তি না হয়।
এই সফরের ফলাফল হিসেবে পরবর্তী দুই-তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দ্বিগুণ করে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহিনীও উপহার দেয়।
অপ্রত্যাশিত এক বন্ধুত্ব
১৯৬১ সালের ২০ মে করাচির উটগাড়ি চালক বশির আহমদের জীবন বদলে যায়, যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন তার সঙ্গে দেখা করেন।
করাচির যানজটে আটকে গিয়ে জনসন গাড়ি থেকে নেমে বশিরের সঙ্গে হাত মেলান এবং তাকে বন্ধু হওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে বশিরকে আমেরিকা সফরের আমন্ত্রণও জানান।
এই ঘটনাটি পরবর্তীতে একটি বিখ্যাত মানবিক গল্পে পরিণত হয়।
কূটনৈতিক বার্তার সেতু
১৯৬৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তান সফর করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল চীনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেই বার্তা বেইজিংয়ে পৌঁছে দেন।
এর দুই বছর পর ১৯৭১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের বিমানে করে চীন সফর করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
১৯৮৪ সালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পাকিস্তানের শাসক জিয়াউল হকের সঙ্গে মুরিতে বৈঠক করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের একটি চিঠি পৌঁছে দেন। আলোচনায় উঠে আসে আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরান-ইরাক সংঘাতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়।
‘কোনো ছবি নয়!’
২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তান সফর করেন, যা ছিল ৩০ বছরের মধ্যে প্রথম।
তিনি সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে প্রকাশ্যে হাত মেলানো বা ছবি তোলা এড়িয়ে যান, যেন তাকে সমর্থন করছেন এমন ধারণা না তৈরি হয়।
ক্লিনটন সরাসরি টেলিভিশনে পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশে ভাষণও দেন।
আকস্মিক সফর
২০০৫ ও ২০০৭ সালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি পাকিস্তান সফর করেন।
২০০৭ সালের সফরটি ছিল ঘোষণা ছাড়া এবং ধারণা করা হয় তিনি তখন পাকিস্তানকে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন।
নিরাপত্তা, ক্রিকেট আর কূটনীতি
২০০৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানে আসেন, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে। তিনি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেন।
এ ছাড়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের অংশ হিসেবে তিনি ইসলামাবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেন এবং ক্রিকেটার ইনজামাম-উল-হকের সঙ্গে দেখা করেন।
পুরস্কার ও সতর্কবার্তা
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০০৯ ও ২০১১ সালে পাকিস্তান সফর করেন।
২০০৯ সালে তিনি পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাকে ‘হিলাল-ই-পাকিস্তান’ পদকে ভূষিত করা হয়।
তবে ২০১১ সালের সফরে তার অবস্থান ছিল কঠোরতর। আলোচনায় উঠে আসে আফগানিস্তান, জঙ্গি ঘাঁটি এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
সূত্র: ডন