সচিবের সই ছাড়া কি প্রকল্প অনুমোদন হতে পারে, কী আছে সার্ভিস রুলে
‘সচিবের সই ছাড়াই পিরোজপুরে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন’—স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এ অভিযোগ এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সাবেক সচিব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের প্রথম দুই কিস্তিতে উপদেষ্টা বা মন্ত্রী এবং সচিবের সরাসরি কোনো ভূমিকা থাকে না। তবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সচিবের নেতৃত্বে কমিটি থাকে। সে ক্ষেত্রে সচিবের সই ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদনের সুযোগ নেই। ফলে প্রকৃত ঘটনা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, যদি ৬ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের দায়িত্বে কারা ছিলেন, তা তদন্ত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। আর যদি ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করা হয়ে থাকে এবং তাতে উপদেষ্টা নিজে জড়িত থাকেন, তাহলে সেটি হবে ‘হোটেলে বসে হাঁস খাওয়ার মতো, যে হোটেলে হাঁসের মাংস কখনোই রান্না হয় না’।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া সচিবের স্বাক্ষর ছাড়াই ফাইল অনুমোদন করেছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তার এই বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এর প্রতিবাদ জানিয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেন আসিফ মাহমুদ। একই সঙ্গে কোন প্রকল্পের ফাইলের কথা বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রশ্ন উঠেছে, সচিবের সই ছাড়া উপদেষ্টা কীভাবে ফাইল অনুমোদন করলেন?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী এমন হওয়ার কথা নয়। সচিব না থাকলে তার দায়িত্বে অন্য কেউ থাকবেন। কিন্তু সচিব অনুপস্থিত থাকলে পরে ব্যাকডেটে সই করার বিষয়টি কীভাবে বৈধ হতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটা ফাইল আমার নজরে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একজন উপদেষ্টা সচিবের স্বাক্ষর ছাড়াই জোর করে ফাইল নিয়ে এসে নিজে স্বাক্ষর করে অনুমোদন দিয়েছেন। এটা তদন্তে আসবে। যেটি একেবারে রুলস অব প্রসিডিউর ও রুলস অব বিজনেসের পরিপন্থী। কারণ, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবের সই ছাড়া কখনোই মন্ত্রী একটি ফাইল অনুমোদন দিতে পারেন না। এটি কখনোই আইনে, রুলস অব প্রসিডিউর বা রুলস অব বিজনেসে নেই।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, সাবেক ওই উপদেষ্টার নাম আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, তদন্তে বিস্তারিত আসবে, এখন এর বেশি বলা ঠিক হবে না।
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ।
১৯৯৬ সালের রুলস অব বিজনেস (২০১৭ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, সচিব মন্ত্রণালয়, সংযুক্ত বিভাগ ও অধীনস্থ কার্যালয়গুলোর প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। তিনি নিশ্চিত করবেন, বরাদ্দকৃত তহবিল বিদ্যমান আইন ও নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় হচ্ছে।
রুলস অব বিজনেসের অনুচ্ছেদ ৭-এ বলা হয়েছে, কোনো মন্ত্রী অন্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বিষয় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। মতৈক্য না হলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সচিবের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়া কিংবা প্রধান উপদেষ্টার কাছে ফাইল উপস্থাপন না করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ফাইলে উপদেষ্টা বা মন্ত্রী অনুমোদন দিতে পারেন না।
শনিবার (২৩ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘হতে পারে সচিব দেশে নেই। অতিরিক্ত সচিবের স্বাক্ষরের পর ফাইল আমার কাছে এলো, আমি স্বাক্ষর করলাম, তারপর ফাইল প্রসেস হলো। এটাও লিগ্যাল। আরেকটা ক্লজ আছে, যদি কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয় এবং সচিব উপস্থিত না থাকেন—বিদেশে, ছুটিতে বা অন্য কোনো কারণে—তাহলে উপদেষ্টা সরাসরি যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিবের স্বাক্ষরের পর ফাইল অনুমোদন করতে পারেন। এটা অবৈধ না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সচিব না থাকলে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার হলে মন্ত্রী বা উপদেষ্টা স্বাক্ষর দিতে পারেন। কারণ, চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হচ্ছেন মন্ত্রী বা উপদেষ্টা।’
তবে তিনি বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখনকার সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, এমন কোনো ফাইল হওয়ার সুযোগ নেই। যদিও এটা লিগ্যাল, কিন্তু আমাদের সময়ে এমন কিছু হয়নি।’
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, ‘অনেক সময় ফাইল অপেক্ষায় রাখা হয়। আবার এমনও হয়, উপদেষ্টা সই করে দিলেন, পরে সচিব ব্যাকডেটে সই করলেন। এই প্র্যাকটিসটা লিগ্যাল কি না, আমি নিশ্চিত না। তবে প্রশাসনে এমন প্র্যাকটিস আছে। প্রধান উপদেষ্টার ক্ষেত্রেও অনেক সময় সবার সম্মতি নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়, পরে সই নেওয়া হয়।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও কলামিস্ট আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলেন, ‘সচিব হচ্ছেন প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার। পরিকল্পনা ও অর্থছাড় একটি বড় সিস্টেমেটিক বিষয়। সিস্টেমের বাইরে যাওয়া যায় না।’
তিনি বলেন, ‘পিরোজপুরের ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের টাকা উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর অনুমোদনে ছাড় হয় না। প্রকল্প পরিচালক থাকেন, তার মাধ্যমেই ঠিকাদারকে অর্থ দেওয়া হয়। ঠিকাদারকে অর্থ প্রদানের বিষয়টি সাধারণত মন্ত্রণালয়ে আসে না।’
তার ভাষ্য, অনুমোদিত প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ে উপদেষ্টা, মন্ত্রী বা সচিবের কোনো ভূমিকা থাকে না। তবে মনিটরিংয়ে তাদের ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি কাজ না করেই ছয় হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের দায়িত্বে কারা ছিলেন, তা তদন্ত করে বের করতে হবে। অন্য খাতেও এমন হয়ে থাকলে তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।’
প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলেন, পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে মন্ত্রণালয়ে সচিবের সভাপতিত্বে সভা হয়। সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা যাচাই করা হয়। সচিব অনুপস্থিত থাকলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত দায়িত্ব হিসেবে ফাইল পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে পারেন।
সরকারের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী কোন ফাইল কোন পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য, তা নির্ধারিত থাকে। কিছু ফাইল যুগ্ম সচিব, কিছু অতিরিক্ত সচিব, কিছু সচিব বা মন্ত্রী পর্যায়ে নিষ্পত্তি হয়।
তার ভাষ্য, ‘সচিবের সই ছাড়া ফাইল অনুমোদন স্বাভাবিক নয়। আমি বিদেশে গেলে স্ট্যান্ডিং অর্ডার দিয়ে যেতাম—জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু রুটিন দায়িত্বের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।’
তিনি বলেন, ‘সচিবের অনুপস্থিতিতে পরে ব্যাকডেটে সই করার বিষয়টি নিয়মের মধ্যে পড়ে না। সচিব পরে সই নাও করতে পারেন। তখন তাকে কার্যত বাধ্য করা হয়।’
এই সাবেক সচিব আরও বলেন, ‘ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সচিব পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য না হলে, সেটি মন্ত্রী পর্যায়ে যাবে কি না, সেটিও সচিব দেখবেন। এখন ই-ফাইলের যুগে দূরত্ব কোনো বিষয় নয়। স্ক্যান করে ফাইল পাঠিয়ে সচিবের অনুমোদন নেওয়া সম্ভব।’
তার মতে, সচিবের নিষ্পত্তিযোগ্য ফাইল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করতে পারবেন না, যদি না সচিব তাকে সেই ক্ষমতা দিয়ে যান।