পাচার করা সম্পদ ফিরিয়ে আনা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জানিয়েছেন, দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ ফিরিয়ে আনার কার্যক্রমকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গতকাল বুধবার সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তরে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। প্রশ্নোত্তর পর্বের প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ছিল।
কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপি দলীয় সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১ মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করে।
তারেক রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচারের অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ সম্পাদন ও বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ও অগ্রাধিকার পাওয়া ১০ দেশের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংক-চায়না) তিনটির (মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছে। অন্য সাত দেশের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে গঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকার পাওয়া ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত অগ্রাধিকারভুক্ত ১১টি মামলা হচ্ছে–সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; এস আলম গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; বেক্সিমকো গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; সিকদার গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; বসুন্ধরা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; নাসা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; ওরিয়ন গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; নাবিল গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান; এইচ বি এম ইকবাল, তাঁর পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এবং সামিট গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান।
এসব মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালত ২৫ মার্চ পর্যন্ত ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। পাচারের অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।
অর্থ পাচারকারীর তালিকা প্রস্তুতসহ শাস্তির আওতায় আনা হবে কিনা–জামায়াতের সদস্য মুজিবুর রহমানের এমন সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরির দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের না। এর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আছে। তারা এটি করছে। তিনি বলেন, অতীতে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের ইচ্ছা আগ্রহের কারণে আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে যাকে যেভাবে পেরেছে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। যার কাছ থেকে যেরকম দরকার মনে হয়েছে জোর করে লিখিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমান সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দেশের প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে বিচার করতে চায়। যাতে কোনো মানুষ ন্যায্য আইন থেকে বঞ্চিত হতে না পারে। এজন্য আইনিভাবে সব প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। দেশের অর্থ তছরুপ করে যারা বিদেশে পাচার করেছে প্রচলিত আইনে নির্ধারিত হবে তাদের শাস্তি।
পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে
পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এ কার্ড পরিবারের নারীপ্রধানকে দেওয়া হবে। ফলে এই সহায়তাটি যেমন সরাসরি পরিবারের সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হবে; তেমনি পরিবারের সম্পদের ওপর নারীপ্রধানের নিয়ন্ত্রণ বাড়ার পাশাপাশি মর্যাদাও বাড়বে।
একই সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ১০ মার্চ দেশের ১৩ জেলার তিনটি সিটি করপোরেশন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারকে ভাতা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরও ৩০ হাজার পরিবারকে এ কর্মসূচি আওতায় আনা হবে। আগামী চার বছরের মধ্যে চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দেশের মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা পালনের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।
এনসিপির আখতার হোসেন তাঁর সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ যেসব কার্ড দেওয়া হচ্ছে তা কত ব্যক্তি ও পরিবারকে দেওয়া হবে? এতে কত টাকা বাজেট বরাদ্দ হবে? এটা বাস্তবায়নে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তখন সরকারের পরিকল্পনা কী হবে?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খাতে কত বাজেট তা এখনই বলছি না। পর্যায়ক্রমে এসব জিনিস আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডধারীরা মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। একবারে আমরা সবাইকে দেব না। পৃথিবীর কোনো দেশের পক্ষেই একবারে সবাইকে দেওয়া সম্ভব না। আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতি মাসে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়াতে থাকব। প্রতি বছরই আমরা বাজেটে বরাদ্দ বাড়াব। আমরা টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না যে, মূল্যস্ফীতি হবে। কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে না বরং এই টাকা আমরা যাদের দেব তারা নিশ্চয়ই বিভিন্ন দেশে পাচার করবে না। এই টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যয় হবে। এতে করে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও কর্মসংস্থান বাড়বে। আমাদের কোনো গবেষণা বলছে না মূল্যস্ফীতি হবে, বরং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নতি হবে।
কুড়িগ্রামে ভুটানের অর্থনৈতিক জোন নির্মাণের অগ্রগতি সংসদকে জানালেন প্রধানমন্ত্রী
কুড়িগ্রামে ভুটানের অর্থনৈতিক জোন নির্মাণের অগ্রগতি জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদের এক প্রশ্নে লিখিত জবাব দেন সংসদ নেতা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৩ সালে লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে ভুটানের রাজা কুড়িগ্রামে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আগ্রহ দেখান। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ভুটানি বিনিয়োগকারীর জন্য কুড়িগ্রামে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মাধবরাম মৌজায় ‘কুড়িগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল-১’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। পরে ভুটানের রাজার আগ্রহে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) যৌথ উদ্যোগে বেজা ওই স্থানে একটি ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে।
সংসদ নেতা জানান, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার জন্য বেজার অনুকূলে ১৫০.০৭ একর খাসজমি এবং ৬৯.৫৭ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি বরাদ্দ বা অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত বেজা ওই মৌজায় ১৩৩.৯২ একর জমির মালিকানা লাভ করেছে। একই মৌজায় আরও ৬১.৮৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভুটানের রাজা ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। এ সময় তিনি প্রস্তাবিত ‘ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ পরিদর্শন করেন। পরে জিটুজি ভিত্তিতে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।