অর্থনীতিতে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: সিপিডি

0

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। অর্থনীতিকে শুধু স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো নয়, বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেওয়া সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

বুধবার (৪ মার্চ) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার যৌথভাবে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন।

রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন : স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে নয়, তবে এটি প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে।

তাঁর মতে, বর্তমান সময়টি নীতিগত পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যেখানে কঠোর সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল ৪.২ শতাংশ। শিল্প উৎপাদন ও সেবা খাতে ভোগব্যয় কমেছে এবং নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখা গেছে। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, তবু এই গতি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬৬ শতাংশে দাঁড়ালেও মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১২ শতাংশ। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

রাজস্ব পরিস্থিতি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ৬.৭৮ শতাংশে, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম।

যদিও এটি এখনো বিপজ্জনক পর্যায়ে যায়নি, তবে ভবিষ্যতে সুদের বোঝা বাজেটের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনি সংস্কার ছাড়া ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে না।

বৈদেশিক খাত নিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ২১.৭৬ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখীকরণ জরুরি।

অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগভিত্তিক টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। তিনি জানান, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরাই সহায়তা পান। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমাতে রিনেগোসিয়েশন ও সিস্টেম লস কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, শুধু ভালো নীতি গ্রহণ করলেই হবে না, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন।

পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৮.৫ শতাংশ, যেখানে বিশ্বে তা ২-৩ শতাংশের মধ্যে। এর ওপর জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।

জেলা পর্যায়ে অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা করের আওতার বাইরে থাকেন। এসব বিত্তশালীকে করের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের জন্য অনেক সময় কারখানা তৈরি করেও বছরের পর বছর বসে থাকতে হয়; আর এটাই বাস্তবতা বলে মন্তব্য করেছেন বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। তিনি বলেন, এই সরকার নতুন কোনো শিল্প বা কর্মসংস্থান দেখবে না। বর্তমানে ৩৫০টি পোশাক কারখানা এবং ৫০টির বেশি বস্ত্র কল বন্ধ হয়ে গেছে।

আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন ছাড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। সমাপনী বক্তব্যে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন সরকারের সামনে সুযোগ আছে, কিন্তু সময় খুব কম। এখনই সাহসী ও কার্যকর সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই পথে এগিয়ে নেওয়াই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.