মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজিরবিহীন নির্দেশ ও মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সারেকশান অ্যাক্ট ১৮০৭ অনুসারে গৃহযুদ্ধ বা কোনো বিদ্রোহ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে সুরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করতে পারেন। তবে সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে আন্দোলনকারীদের আটকাতে ন্যাশানাল গার্ড ও ৭০০ মেরিন সেনা মোতায়েন করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ট্রাম্পের এমন নির্দেশের পর প্রশ্ন উঠেছে- কোথায় দাঁড়িয়ে মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ?
লস আঞ্জেলেস এখনো থমথমে। মেয়র ক্যারেন বাস রাত্রিবেলা কারফিউ জারি করার নির্দেশ দিলেও মঙ্গলবারও অভিবাসীদের সঙ্গে নিরাপত্তা রক্ষীদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের কথা শোনা গেছে। ট্রাম্প আন্দোলনকারীদের আটকাতে প্রথমে ন্যাশনাল গার্ড এবং পরে প্রায় ৭০০ মেরিন সেনা নিয়োগ করেছেন।
অভিবাসন সংক্রান্ত সঠিক কাগজপত্র না থাকায় ধরপাকড় শুরু করেছিল ফেডারেল ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)। এই রেইডকে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতির অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে। শুক্রবার থেকে তারই প্রতিবাদে লস আঞ্জেলেসের রাস্তা দখল করতে নামেন আন্দোলনকারীরা। এরই মধ্যে ট্রাম্প খানিকটা নজিরবিহীনভাবেই আন্দোলনকারীদের আটকাতে সেনা মোতায়েন করেন।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এবং ইন্সারেকশান অ্যাক্ট
সাধারণভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাজ্যে প্রেসিডেন্ট একা ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করতে পারেন না। সেই স্টেটের গভর্নরেরও সায় লাগে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনে রাজি ছিলেন না। পরে তাকে এড়িয়েই এই নির্দেশ দেন ট্রাম্প।
মার্কিন ইন্সারেকশান অ্যাক্ট ১৮০৭ অনুসারে গৃহযুদ্ধও বা কোনো বিদ্রোহ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট একা এই সুরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করতে পারেন। তবে আমেরিকার চালু ফেডারেল ব্যবস্থায় এটি স্বাভাবিক ঘটনা নয়। গভর্নর নিউসম অভিযোগ করেছেন ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।
তিনি বলেন, ‘ক্যালিফর্নিয়া প্রথম। কিন্তু শেষ নয়। এর পর অন্যান্যও স্টেটেও একই কাজ করবেন ট্রাম্প।’
বিচারও ব্যবস্থাকেও পাশ কাটিয়ে নির্দেশ
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ট্রাম্প এর আগে দেশের বিচার ব্যবস্থাকেও পাশ কাটিয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মার্চ থেকে প্রায় ২৫০ জন অভিবাসীকে জঙ্গি সন্দেহে এল সালভাদোরে পাঠিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে এলিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট ১৭৯৮-কে সামনে রেখেছে প্রশাসন। তাদের দাবি এল সালভাদোরে পাঠানো অভিবাসীরা ট্রেন দে আরাগুয়ার সদস্য।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকাঠামোয় বিচারব্যবস্থা সরকারের মূল স্তম্ভগুলির একটি। সমালোচকদের দাবি, ট্রাম্প সেই ব্যবস্থার অবমাননা করছেন। সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতির মধ্যে ছয়জন রক্ষণশীল। তাদের মধ্যে তিনজনকে নিয়োগ করেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ক্রমাগত কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। ১০ জুন পর্যন্ত কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে মোট ১৬১টি একজিকিউটিভ অর্ডার দিয়েছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে রয়েছে এলজিবিটিকিউআইএ-প্লাস সংক্রান্ত নির্দেশ থেকে বাণিজ্য সংক্রান্ত নির্দেশ। সিনেট বা হাউজ অফ রিপ্রেসেন্টেটিভকে পাশ কাটিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই সময়ের মধ্যে এটি সব থেকে বেশি অর্ডার।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির জন প্রশাসন এবং নীতির অধ্যাপক প্যাট্রিক ম্যালোন ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘একজিকিউটিভ অর্ডারকে শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়ার নিদর্শন রাখবেন ট্রাম্প।’ একই সঙ্গে সরকারি দক্ষতার নামে সরকারি কর্মচারিদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তর আইনি যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তগুলি অচিরেই আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়বে।’ তবে তিনি নিশ্চিতভাবেই জানান যে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি একথাও পরিষ্কার করে দেন যে আইনের ধারাগুলির মাধ্যমে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেই আইনগুলির বাস্তবতা সম্পূর্ণ অন্য ছিল। তবে দেশের গণতন্ত্র যে শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে সে বিষয়ে আশাবাদী তিনি।