রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের চাপ বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৮২ থেকে ৯০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে। এভাবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর জনসংখ্যাগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের শুধু মিয়ানমারে ফেরত পাঠালেই সংকটের সমাধান হবে না; সেখানে তাদের নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও একজন নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপ মিলনায়তনে নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক নীতি সংলাপে’ তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকট। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নয়। এই সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানের দায়িত্বও মিয়ানমারকে নিতে হবে। একই সঙ্গে সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে উঠে এসেছে। ইউএনএইচসিআরসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। নিজ দেশে নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার অধিকারও তাদের রয়েছে। প্রত্যাবাসন এমন হতে হবে যেন তারা আবারও বাস্তুচ্যুতি ও নির্যাতনের শিকার না হন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেওয়া কিংবা তাদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া সংকটের সমাধান হতে পারে না। প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ দিতে হবে। সেখানে তাদের নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, শিক্ষার অধিকারসহ একজন নাগরিকের প্রাপ্য সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ অন্যতম শরণার্থী গ্রহণকারী দেশ। সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের একটি দেশ হয়েও বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এটি দেশের জন্য বড় ধরনের চাপ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৮২ থেকে ৯০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে। এভাবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর জনসংখ্যাগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত। তাই বিষয়টি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ সংকট মোকাবিলায় একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।
রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনায় উত্থাপিত দাবির প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক বাস্তবতা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। সব দিক পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অতীতের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, সেসব অভিজ্ঞতা ও পথ অনুসরণ করে বর্তমান সরকারও এ সংকটের কার্যকর পরিণতি নিশ্চিত করতে চায়।
নীতি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি জটিল নীতিগত ও আন্তর্জাতিক বিষয়। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সরকার শিখতে এবং তাদের পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে আগ্রহী। নীতি গবেষণা কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠান সরকারের পাশে থেকে ওয়াচডগ ও দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে। এ বিষয়ে তাদের যে কোনো গঠনমূলক সুপারিশ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা বা উপস্থাপনা দেওয়া হলে সরকার তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করবে।