কী বার্তা নিয়ে জাতিসংঘে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

0

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অংশগ্রহণ শুধু একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর নয়, বরং পরিবর্তিত বাংলাদেশের নতুন পরিচয় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই সফরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের ভূমিকার বার্তা সামনে আসতে পারে।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার আরও বড় একটি কারণ আছে।

সেটা হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি ২০২৬ সালের ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

নতুন বাংলাদেশ তুলে ধরার কূটনৈতিক সুযোগ

ঢাকার একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের অন্যতম বড় বার্তা হবে, বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধ্যায়ের দিকে যাত্রা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি দেখাতে চাইবেন, বাংলাদেশ শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক অংশীদার হতে চায়।

নতুন বাংলাদেশের ধারণার মূল জায়গাগুলো হতে পারে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যও হলো, ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’, যা বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই সংকট এখন শুধু মানবিক নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।

জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বার্তা দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি; রোহিঙ্গা সংকটের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আরও আন্তর্জাতিক সহায়তা দেওয়া।

জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করবে বাংলাদেশ। এতে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে ড. খলিলুর রহমানের নিজেরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

খলিলুর রহমানের সভাপতিত্ব: বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সুবিধা?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে একজন বাংলাদেশির থাকা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের কণ্ঠ আরও দৃশ্যমান করা, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন ও শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা তুলে ধরা, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থে নেতৃত্ব দেওয়া।

খলিলুর রহমান জাতিসংঘে তার সভাপতিত্বের জন্য আস্থা পুনর্গঠন, সংলাপ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। যদিও ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জাতিসংঘের সভাপতি হিসেবে বিশ্বের সব দেশকেই তিনি সমানভাবে গুরুত্ব দেবেন।

তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরের গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরের আলাদা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এটি হবে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রথম বড় বৈশ্বিক উপস্থিতি। এই সফরে তিনি বেশ কয়েকটি বার্তা দিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে, বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ কোনো একক বলয়ের নয়, বরং সবার সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সুশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চায়। বিশ্ব শান্তিরক্ষা, জলবায়ু, খাদ্য নিরাপত্তা, অভিবাসন ও মানবিক সংকটে বাংলাদেশ তার দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখতে চায়।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ২১-২৬ সেপ্টেম্বর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তিনি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই অল্প সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ব্যস্ত শিডিউল থাকবে। তিনি সান ফ্রান্সিসকোতে প্রবাসীদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে এই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে কোন কোন বিশ্বনেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। এ নিয়ে প্রস্তুতি চলছে।

রাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিফলন নয়, এটি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অবস্থানের রূপরেখাও তুলে ধরে। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এই সফর হবে আন্তর্জাতিক আস্থার পরীক্ষার প্রথম বড় মঞ্চ। আর খলিলুর রহমানের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে একটি অনন্য কূটনৈতিক পরিবেশ। দুয়ে মিলে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিশন তুলে ধরবেন। একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের লক্ষ্যগুলো বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিশ্বশান্তি, টেকসই উন্নয়ন, দ্বন্দ্ব নিরসন, দারিদ্র্য বিমোচন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এই সংকটকে বিশ্বের নজরে রাখতে জাতিসংঘের সাইডলাইনে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনার আয়োজন করা হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যা বলছেন

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আওতায় দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়নের সুযোগ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এটি একটি নতুন যাত্রা, নতুন সম্ভাবনা ও নতুন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন।

সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করবেন। শামা ওবায়েদ আরও বলেন, এবারের অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে। কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.