রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ-দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার: অর্থমন্ত্রী

0

দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করা যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সুনিপুণভাবে করে গেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী এসব কথা জানান ৷ এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

বিগত ১৬ বছরে আর্থ-সামাজিক সূচকসমূহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিকে তাকালে সংখ্যাটা প্রথমে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। মাথাপিছু আয়ের সংখ্যা নিয়েও বড় বিতর্ক আছে।

মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু সেই আয়ের সিংহভাগ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর হাতে। সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে বৈষম্য বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (HIES)-এর তথ্য অনুযায়ী, আয়-ভিত্তিক গিনি কোফিশিয়েন্ট ২০০৫ সালে ছিল ০.৪৬৭। ২০০৫ এর পর থেকে এই সূচকের ধারাবাহিক অবনতি হয়ে সর্বশেষ ২০২২ সালে এসে পৌঁছায় ০.৪৯৯ পয়েন্টে।
২০০৫ সালে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ খানার আয় ছিল সবচেয়ে কম আয়ের পাঁচ শতাংশ খানার ৩৫ গুণ; ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ গুণ। ফলশ্রুতিতে একটি বৈষম্যমূলক অলিগার্কিক সমাজের উত্থান হয়েছে।

তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভাতা প্রদান করা হলেও এর কাভারেজ ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিকীকরণ করা হয়নি। এতে উপকারভোগীরা অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে, যা ক্রমান্বয়ে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচনেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে। এ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করা যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সুনিপুণভাবে করে গেছে। প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ব্যুরোক্রেসি একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি রাজনৈতিক সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিগত ১৬ বছরে এটিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অর্থনীতির ব্যাকবোন হিসেবে খ্যাত আর্থিক খাত ধ্বংসের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য দুটি সূচক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার এবং মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি রেশিও (সিএআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই চিত্র আমূল পাল্টে গেছে- সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে। এখানে উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, মূলধন পর্যাপ্ততার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে সিএআর ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে নেমে আসে। মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো এ ব্যাংকগুলো কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়- এটি দীর্ঘ দেড় দশকের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অনিবার্য পরিণতি। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম স্তম্ভ হলো রাজস্ব আহরণ। অথচ দীর্ঘদিন রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে কর আহরণের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হয়নি। একইভাবে, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতার কারণে নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জনের একটি তথ্য বিভ্রাট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, যা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে এ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি এমন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে বহিঃখাতের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা একযোগে বিদ্যমান ছিল। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। উল্লিখিত চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকেই তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে দেশ পরিচালনা এবং তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.