অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর সময়ে দেশের তেমন কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি: আনু মুহাম্মদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের তেমন কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে আহত, নিহত ও নিখোঁজদের পূর্ণ তালিকা ও পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এতে সমন্বয়হীনতাও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
শনিবার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর: দায়িত্ব ও ভূমিকা পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে গত এক বছরে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করেন বক্তারা। এতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রে এক-এগারোর প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হয়েছে। এটা ভালো কথা। তবে সে সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা কী ছিল, সেটি ব্যাখ্যা করতে হবে। কারণ তখন তাকে অনেক তৎপর দেখা গেছে। তিনি নিজেও নাগরিক শক্তি নামে একটি রাজনৈতিক দল খুলতে চেয়েছিলেন। পরে নানা কারণে এ ক্ষেত্রে আর এগোননি।
তিনি বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে সরকারকে পক্ষপাতহীন হতে হবে। না হলে নির্বাচন নিয়ে নতুন বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই সরকারকে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে মাজার, ভাস্কর্য ভাঙচুর ও হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপে সন্তোষজনক অগ্রগতি নেই। সরকারের কোনও কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তি এটিকে সাফাই গেয়েছেন। বলছেন, এটি নাকি পেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করছে। অথচ পেসার গ্রুপে কাজ হওয়ার কথা দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। আর মব সৃষ্টিকারীরা জাতিগত, ধর্মীয় সংখ্যা লঘু ও নারী বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড করছে।
আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে করা শ্রমিকদের মামলা প্রত্যাহার হয়নি। কিন্তু ড. ইউনূসসহ ক্ষমতাবানদের মামলা ঠিকই তুলে নেওয়া হয়েছে। আর বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও কোনও পরিবর্তন হয়নি। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখনও হচ্ছে। এসব বিষয়ে বিশেষ তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত।
তিনি ৭৪-এর বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল না করার সমালোচনা করেন। বিগত সরকারের নিবর্তনমূলক আইন বাতিলের দাবি জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, এক বছরে বিশ্ব ব্যাংক, আইএএফ ও জাইকার ওপর নির্ভরশীলতা কমার পরিবর্তে বেড়েছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যকীকরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে সরকারের দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি। তবে সরকারের বিভিন্ন সমালোচনা থাকলেও এক বছরে অর্থ পাচার কমেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে ধ্বস নেমেছিল, তাতে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে রামপাল, আদানি ও এলএনজি চুক্তির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিদেশি আমদানি নির্ভর জ্বালানি চুক্তিতে সরকার কোনও পরিবর্তন করতে পারেনি।
তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে বিভিন্ন কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কমিশন নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেকে ছাত্রলীগের মতো হতে চায়। সেটি অশনিসংকেত। তবে আশার দিক হলো, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে।
শিল্পকলা একাডেমির দুর্দশা দূর করা হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমি সামরিক বাহিনীর দখলমুক্ত করতে হবে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা না বাড়িয়ে তা দখল করা হয়েছে। অথচ জুলাই আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। আমাদের তরুণদের ক্রীড়া চর্চার জন্য উন্মুক্ত জায়গা দখলমুক্ত করতে হবে। এছাড়াও পাহাড় ও সমতলে বৈষম্য, নারী কমিশনের প্রতি হিংস্র আক্রমণ, লিঙ্গ বৈষম্য ও বিভিন্ন দেশে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিপীড়নসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে সরকার দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন আনু মুহাম্মদ।