বিএনপি স্বপ্ন বিক্রি করে না, বিএনপি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে: তারেক রহমান
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্য বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতার ইতিহাস, গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের রূপরেখা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে প্রয়াত কমরুদ্দিন সাহেবের স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এই মানুষটি যেভাবে তার সময়ের সবকিছু দিয়ে আমাকে চিকিৎসার সাহায্য করেছিলেন, তার জন্য আমি তার এবং তার পরিবারকে কৃতজ্ঞতা জানাই।’
এরপর তিনি মহান বিজয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, ‘প্রায় ৫৫ বছর আগে লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগ, লক্ষ মা–বোনের সম্মান এবং বহু মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম।’
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) যুক্তরাজ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে যারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক সুবিধা দেখে স্বাভাবিকভাবেই ভাবেন—নিজেদের দেশটিও যদি এমন হতো।
স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্রের চর্চা হবে, কিন্তু বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেই পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি হঠাৎ করে বাকশাল চলে আসল। এরপর ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলো। এর মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের গতি ও মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা থামিয়ে দেওয়া হলো।’
তিনি আরও বলেন, সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের পর ১৯৯১ সালে জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয় এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে।
বিএনপি সরকারের সময়কার উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে ৮৪ হাজার শিল্পকারখানা স্থাপিত হয়েছিল—যা সংসদে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত। তিনি বলেন, ‘এই সংখ্যাই প্রমাণ করে সে সময় দেশে উন্নয়নের একটি গতিধারা চালু হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় শুরু হওয়া গার্মেন্টস শিল্প ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স—এই দুটি খাত আজও দেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ।
স্বাস্থ্য খাতের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, উপজেলা পর্যায়ে ৫১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান, আর পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সেগুলো সম্প্রসারণ করে। তিনি বলেন, ‘আজও গ্রাম-গঞ্জের মানুষ চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই যায়।’
গত ১৬ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ২০০৮ সাল থেকে বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর বিএনপির লাখো নেতাকর্মী রাজপথে ছিলেন মানুষের ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলনে আমাদের হাজারের মতো নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন, হাজারের বেশি নেতাকর্মী খুন হয়েছেন।’
তিনি বলেন, আন্দোলন সফল হলেও বিজয় ধরে রাখা আরও কঠিন। সামনে বহুল প্রত্যাশিত একটি নির্বাচন আসছে, যেখানে মানুষ নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে—এমন প্রত্যাশা দেশের মানুষের।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি স্বপ্ন নয়, পরিকল্পনার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তিনি বলেন, ‘আমি স্বপ্নের মধ্যে নাই, আমরা আছি পরিকল্পনার মধ্যে। আমরা পরিকল্পনা করব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।’
তিনি বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, স্বৈরাচার পতনের আড়াই বছর আগেই এই কর্মসূচি জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি বলেন, কেউ যদি এর চেয়েও ভালো প্রস্তাব দেয়, বিএনপি তা সানন্দে গ্রহণ করবে।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চার কোটি পরিবারের গৃহিণীদের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকর—তা নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, ‘এই ফ্যামিলি কার্ড কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি পরিকল্পনা।’
একইভাবে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেড় কোটি কৃষককে তথ্যভিত্তিক সহায়তা, সহজ ঋণ, আবহাওয়াভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কোল্ড চেইন সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চাকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে তিনি গ্রাম পর্যায়ে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা বলেন, যারা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধে কাজ করবেন।
বক্তব্যের শেষভাগে তারেক রহমান প্রবাসীদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি আহ্বান জানান, আগামীর বাংলাদেশ গঠনে পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রবাসীদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন কোনো এক্সপেরিমেন্টের সুযোগ নয়, এটি পরিবর্তনের সুযোগ।’