রাষ্ট্রগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করার নতুন অজুহাত দিয়েছে করোনাভাইরাস

0

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তা ফরাসি লেখক জ্যাঁ-ব্যাপ্টাইজ আলফোসোঁর লেখায় ফুটে ওঠেছে: যত বেশি পরিবর্তন হবে, তত বেশি অবস্থা আগের মতো থাকবে।

করোনাভাইরাস বিশ্বের শক্তিগুলোকে আঘাত করার ফলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাত আগের তীব্রতাতেই অব্যাহত আছে। আন্তর্জাতিক ও আন্তঃসাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সহাযোগিতার আকুল আবেদন সত্ত্বেও জাতীয় ও ভূ-কৌশলগত অগ্রাধিকারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মানবজাতির প্রতি মারাত্মক হুমকির মুখেও লক্ষ্য সংশোধন করার আহ্বানে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

ওয়ার্ল্ড মেটার্স ইনফোর তথ্যানুযায়ী, করোনাভাইরাসের পজেটিভ পাওয়া গেছে ৪৬৮,২৫২টি, মৃত্যু হয়েছে ২১,১৮৪ জন। প্রতি মিলিয়নে চীনে ২, ইতালিতে ১২৪, যুক্তরাষ্ট্রে ৩, ইরানে ২৫ জন। বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে প্রায় ছয় লাখ লোকের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে

কোভিড-১৯ প্রতিরোধের তহবিল ঘোষণা করা হলেও তা খুবই কম। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ভাইরাসটি প্রচণ্ড ক্ষতি করে গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র

ডিফেন্স ওয়ান ওয়েবসাইটে কেবিন ব্যারন এখনো ‘আমেরিকান ফার্স্ট’ নামের প্রিয় নীতি অনুসরণ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি হিসেবে বিশ্বের এই বিপর্যয়ে তাকেই ত্রাতার ভূমিকায় নেতৃত্ব দেয়া দরকার ছিল।

ভাইরাস মহামারীর প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য তুলে ধরে তার সমালোচনা করেছেন ব্যারন। ট্রাম্প বলেছিলেন, আমাদের নিজেদের টিকে থাকার জন্য বিদেশী কোনো দেশের ওপর আমাদের ভরসা করে থাকা উচিত নয়। এই সঙ্কট আবারো আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, কঠিন সীমান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে আমেরিকান রোগীদের জন্য আমেরিকান ওষুধ, আমেরিকান হাসপাতালগুলোর জন্য আমেরিকান সরবরাহ, আমেরিকার মহান বীরদের জন্য আমেরিকান সরঞ্জাম।

ব্যারন উল্লেখ করেন, ট্রাম্প ২০১৬ সালে যে প্লাটফর্ম করে নির্বাচিত হয়েছিলেন, চলতি বছর একই প্লাটফর্ম ব্যবহার করেই জয়ী হতে চান। এটি হলো বিশ্বায়নকে প্রত্যাখ্যানকারী লোকরঞ্জক বিষয়। ২০২০ সালের লড়াইয়ে প্রায় সব ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী ট্রাম্প বা তার অনুভূতিকে ব্যবহার করে ঘরোয়া ইস্যুগুলোর ওপর প্রবল জোর দিচ্ছেন।

চীনের সাথে আইনগত বিবাদ

এদিকে করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে চীনের সাথে অব্যাহতভাবে বিবাদে লিপ্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনভিত্তিক আইনজীবী ল্যারি ক্লিম্যান নোবেল করোনাভাইরাস সৃষ্টি ও ছেড়ে দেয়ার জন্য চীনের বিরুদ্ধে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মামলা করেছেন। টেক্সাসভিত্তিক কোম্পানি ফ্রিডম ওয়াচ অ্যান্ড বাজ ফটোসের পক্ষ থেকে টেক্সাসের একটি আদালতে এই মামলা দায়ের করা হয়।

চীন সরকার চীনে করোনাভাইরাস নিয়ে আসার জন্য আমেরিকান সৈন্যকে দায়ী করার পর মার্কিন সরকার ওই ভাইরাসের দায় চীনাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন অভিযোগ করেছে, চীন দীর্ঘ সময় ভাইরাসটির বিস্তারের খবর চেপে গিয়েছিল, এমনকি যে লোক বিপদসঙ্কেত দিয়েছিল, তাকে শাস্তি পর্যন্ত দিয়েছিল।

উহানে ২০১৯ সালের অক্টোবরে ওয়ার্ল্ড মিলিটারি গেমসে অংশগ্রহণকারী ২৮০ মার্কিন সৈন্যের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়ানো হয়েছিল বলে চীন যে দাবি করেছে, রাশিয়া তাতে সমর্থন দিয়েছে। এদিকে মার্কিন মানাবাধিকার আইনজীবী ফ্রান্সিস বোয়লে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জীবাণু অস্ত্র হিসেবে সার্স ভাইরাস উদ্ভাবন করেছিল। তিনি চ্যাপেল হিলে নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাপত্রের কথা উল্লেখ করেন।

করোনাভাইরাস: ইরানের সাথে সঙ্ঘাতের এক নতুন মঞ্চ

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, মার্কিন বন্দীদের ইরান মুক্তি না দেয়ায় তারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত ইরানে মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে না। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি অভিযোগ করেছেন, ইরানি জনগণকে ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র গবেষণাগারে তৈরী করোনাভাইরাস পাঠাচ্ছে। তিনি বলেন, ইরান এ ধরনের সহায়তা গ্রহণ করবে না।

আফগানিস্তানে সঙ্ঘাত অব্যাহত

আফগানিস্তান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে শান্তিচুক্তিতে সহিংসতা হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। তবে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা আফগানিস্তানে এক বিলিয়ন ডলার সহায়তা হ্রাস করেছে।

এদিকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে আইএস (দায়েশ) একটি শিখ উপাসনালয়ে হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যা করেছে। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধরত ভারতীয় মিডিয়া সাথে সাথে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে এই হামলার পেছনে ছিল পাকিস্তান।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন করোনা মোকাবিলায় সার্ক ভিডিও সম্মেলন আহ্বান করেন, তাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যোগ দেননি। তার বদলে তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা যোগ দেন। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সার্ক দেশগুলো তহবিল সংগ্রহের কথা ঘোষণা করলেও পাকিস্তান তাতে এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। এর বদলে পাকিস্তান সার্কের মহাসচিবের তদারকিতে (ভারতের নয়) সার্ক তহবিল ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। সার্ক সচিবালয় নেপালে এবং এর বর্তমান মহাসচিব শ্রীলঙ্কার নাগরিক।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com