প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, জ্বালানিমন্ত্রীর প্রচেষ্টা: দেশে কমছে লোডশেডিং, বাড়ছে গ্যাস
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের চাপ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। দেশে লোডশেডিং কমার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বেড়েছে।
এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে। সংকট সামাল দিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ও বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল ১১টায় সারা দেশে লোডশেডিং ছিল মাত্র ৭২ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৫২ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট।
দুপুর ২টায় লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৪ মেগাওয়াটে। তখন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৯২৬ মেগাওয়াট।
এর আগের দিন শনিবার ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৫৬৮ মেগাওয়াট।
অথচ মাত্র ১০ দিন আগেও দিনের বিভিন্ন সময়ে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছিল। ফলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উন্নতিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সময়ে বেড়েছে গ্যাস সরবরাহও। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর ২টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৬১৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে এক হাজার ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
দুই সপ্তাহ আগেও এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গিয়েছিল। এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র সংকট তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা ও হস্তক্ষেপে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, শিগগিরই জ্বালানি সংকট কেটে যাবে। আগামীতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা থাকবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস খুঁজতে কিছুটা সময় লেগেছে। এর মধ্যে জ্বালানি কেনা হলেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে তা দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এখন জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে আসছে বলে জানান তিনি।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জনগণ আস্থা রেখে সরকারকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা ও দুর্ঘটনার কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে। এখন জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হয়েছে এবং সরবরাহের শিডিউলও ঠিক করা হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জনগণের কষ্ট লাঘবে সরকার বিকল্প উৎস খুঁজে বের করেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বেশি দাম দিয়ে গ্যাস আমদানি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপেই দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই দল হিসেবে কাজ করেছেন বলেও জানান তিনি।
সরকারের কর্মপরিকল্পনায় তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—তিন ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হয়েছে।
পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে এনে শিল্পে সরবরাহ, মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি পুরনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও জোর দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপের কর্মসূচির পাশাপাশি নতুন গ্যাসের সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। সাইসমিক জরিপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করে দ্রুত অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে এসব কেন্দ্রের জ্বালানি কেনার সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে।
এ জন্য সরকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ছয় হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ফার্নেস অয়েল কেনা হচ্ছে। বর্তমানে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে সংকট মোকাবেলায় নেওয়া এসব উদ্যোগের সঙ্গে সরকারের আর্থিক চাপও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এলএনজি সরবরাহ সংকটের কারণে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর লোকসান ও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পরও ডিজেলে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট কাটানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও আমদানিনির্ভরতা কমানোর চ্যালেঞ্জও সরকারের সামনে রয়েছে।