সরকারের গত এক মাসের বিভিন্ন কার্যক্রম ও পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, তরুণদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সুশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে এক মাস আগে আয়োজিত ব্রিফিংয়ের ধারাবাহিকতায় এবারের সংবাদ সম্মেলনে গত এক মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, গত এক মাসে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে সাতটি প্রধান খাতে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো—তারুণ্যের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি; গণমানুষের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়ন; নারীর অগ্রযাত্রা ও সামাজিক সুরক্ষা; পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীল শিল্পায়ন; স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য; যোগাযোগ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, জনকূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক।
তরুণদের জন্য ঋণ ও প্রযুক্তি উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায় ৫০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ৫ হাজার সম্ভাবনাময় তরুণকে প্রাথমিক মূলধন সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জামানত ছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত ‘ই-লোন’ সুবিধা চালু, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনলাইন স্টার্টআপ তহবিল এবং উদ্ভাবকদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যুক্ত করতে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’ আয়োজনের কথা তুলে ধরেন তিনি।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম ও জাতীয় আইসিটি এবং সাইবার সিকিউরিটি রেটিং সিস্টেম চালুর পাশাপাশি দেশে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন উৎপাদনে নীতিগত প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন।
শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতায় জোর
সরকার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন বই যুক্ত করা, প্রায় ৪৫ লাখ মানুষকে কর্মমুখী দক্ষতা দিতে ‘আলফা’ প্রকল্প, চীনের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে সমঝোতা এবং কক্সবাজারে সমুদ্রসম্পদ ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সৌদি সরকারের শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ, এসএসসি পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে দুপুরের খাবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘জাতীয় পে স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন, মোবাইল ভাতা সম্প্রসারণ এবং অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন মাহদী আমিন।
এ ছাড়া ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরাতে কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে পদায়ন বন্ধ, বাবা-মায়ের সম্পত্তি দানের পরও তাদের ভোগদখল ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিল বাড়ানো এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকার কড়াইল, ভাসানটেক ও সাততলা বস্তি পুনর্বাসনে চীনের অর্থায়নে আধুনিক আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব, প্রতিটি জেলায় আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন এবং প্রবাসীদের জন্য ৪১ দেশে এনআইডি ও পাসপোর্ট সেবা আরও সহজ করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।
নারী ও সামাজিক সুরক্ষা
নারীদের অনলাইন হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যৌথ কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও স্কুলে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা, চা শ্রমিক নারীদের নিরাপত্তায় রেইনকোট বিতরণ এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির কথাও বলা হয়।
কারাবন্দিদের পরিবারের সঙ্গে ভার্চুয়াল সাক্ষাতের ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি ফিল্ড ফায়ারিং দুর্ঘটনায় আহত সেনা কর্মকর্তা ও নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রীর দাঁড়ানোর বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিকল্পনা
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশে ১৫০টি নতুন কূপ খনন এবং পরবর্তী ধাপে আরও ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। এলএনজি খালাসের সক্ষমতা বাড়াতে এফএসআরইউয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং ২০২৮ সালের আগে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় টোটাল এনার্জিস থেকে ১৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে ১ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং কারিগরি ত্রুটি সারিয়ে জাতীয় গ্রিডে ১,০৪৬.৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পুনঃসরবরাহের তথ্যও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া জাতীয় গ্রিডে ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা, আগামী পাঁচ বছরে ডিজেলচালিত সেচপাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তর এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন অবকাঠামোর পরিকল্পনা
রাজধানী ঢাকাসহ আট বিভাগীয় শহরে ১৫ তলা বিশেষায়িত জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সাশ্রয়ী ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ এবং বগুড়ার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১,৮০০-তে উন্নীত করার উদ্যোগও রয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
রংপুরে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সেন্টার নির্মাণ, জাতীয় ই-হেলথ প্ল্যাটফর্ম চালু, কমিউনিটি ক্লিনিকে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।
তিনি জানান, গত পাঁচ মাসে সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ওয়ার্ড প্রস্তুত এবং দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরুর কথাও জানান তিনি।
যানজট কমাতে একাধিক পরিকল্পনা
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং ঢাকা-কক্সবাজার রুটে মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়।
মহাসড়কে স্বয়ংক্রিয় ক্যাশলেস টোল ব্যবস্থা চালু, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ডিজিটাল নিবন্ধন ও কিউআর ট্র্যাকিং, ঢাকার পাইকারি কাঁচাবাজার ও বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং মহাসড়কে প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া ঢাকার চারপাশের নদী-খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও নৌপথের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের কথাও উল্লেখ করেন মাহদী আমিন।
সুশাসন ও বৈদেশিক সম্পর্ক
সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বিচারিক উদ্যোগ তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে কার্যকর অধিবেশন এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে সংসদীয় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব করতে ৬৪ জেলা সদরের থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন্ট’ সেবাকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ, মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে ২২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ভূমি অফিসগুলোতে পর্যায়ক্রমে বায়োমেট্রিক হাজিরা চালুর কথাও জানান তিনি।
বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ পরিশোধ, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য বাধা নিরসন এবং হংকংয়ের সঙ্গে বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির অনুমোদনের তথ্য তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্সের আওতায় অবকাঠামো ও পণ্য ক্রয়ে ঋণ সুবিধা, নেপালে মানবিক সহায়তা পাঠানো এবং চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি প্রক্রিয়া শুরুর কথাও জানানো হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন বলেন, গত এক মাসে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
তিনি বলেন, প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকার কাজ করছে।
দীর্ঘ সময়ের সংকট ও ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনে সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব সমস্যার দ্রুত শতভাগ সমাধান সম্ভব না হলেও সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা বিভিন্ন পদক্ষেপে দৃশ্যমান। দল-মত ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নিয়ে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।