ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বছরের পর বছর ফোন হ্যাক করেছে চীন

0

চীন বছরের পর বছর ধরে ডাউনিং স্ট্রিটের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন হ্যাক করেছে। এমনটাই উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই গুপ্তচরবৃত্তি অভিযানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেইজিংয়ের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকারেরা ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ সহকারীর মোবাইল ফোন লক্ষ্যবস্তু করে বলে জানিয়েছে টেলিগ্রাফ। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত ফোন এই হ্যাকের আওতায় পড়েছিল কি না—তা স্পষ্ট নয়। তবে এই ঘটনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র বলেছে, এটি ‘ডাউনিং স্ট্রিটের একেবারে কেন্দ্র পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল।’

এ সপ্তাহে কিয়ার স্টারমার চীন সফরে যাচ্ছেন। এটি ২০১৮ সালে থেরেসা মে–এর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। এই সফরের লক্ষ্য বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা। এই সফরের আগে সরকার লন্ডনে একটি বিশাল চীনা দূতাবাস নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে। টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, এই দূতাবাসটি লন্ডনের সবচেয়ে সংবেদনশীল কিছু যোগাযোগ কেবলের পাশেই স্থাপন করা হবে।

সমালোচকদের অভিযোগ, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশায় লেবার পার্টি চীনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নরম অবস্থান নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ছায়া মন্ত্রী অ্যালিসিয়া কেয়ার্নস—যিনি ওয়েস্টমিনস্টারের কথিত গুপ্তচর মামলার লক্ষ্যবস্তুদের একজন—বলেছেন, ‘আর কত প্রমাণ লাগবে এই সরকারের, যাতে তারা সি চিনপিংয়ের প্রতি তোষামোদ বন্ধ করে, মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং আমাদের দেশকে রক্ষা করে? লেবার আমাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডকে পুরস্কৃত করছে।’

এই হামলার ফলে চীনা গুপ্তচররা সরকারের শীর্ষ সদস্যদের পাঠানো ও প্রাপ্ত বার্তা পড়তে বা ফোনালাপ শুনতে পেরেছে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি তারা যদি সরাসরি ফোনালাপ শুনতেও না পারে, তবু হ্যাকাররা ‘মেটাডাটা’ পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—কে কাকে কতবার যোগাযোগ করেছে এবং ভৌগোলিক তথ্য, যা থেকে কর্মকর্তাদের আনুমানিক অবস্থান জানা সম্ভব।

ডাউনিং স্ট্রিটে এই হ্যাকিং ছিল বেইজিংয়ের একটি বৈশ্বিক গুপ্তচরবৃত্তি অভিযানের অংশ। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ‘ফাইভ আইজ’ গোয়েন্দা জোটের বাকি তিন দেশ—অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড—লক্ষ্যবস্তু হয়। এই অনুপ্রবেশ অন্তত ২০২১ সাল থেকে শুরু হলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি জানতে পারে ২০২৪ সালে। এটি প্রকাশ্যে আসে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জানায়—বেইজিং–সম্পর্কিত হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে চীন লাখো মানুষের ফোনের ডেটায় প্রবেশাধিকার পায়। এতে কল শোনা, বার্তা পড়া এবং ব্যবহারকারীদের অবস্থান ট্র্যাক করার সুযোগ তৈরি হয়।

তৎকালীন মার্কিন উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যান নিউবার্গার বলেন, হ্যাকারদের ‘ইচ্ছেমতো ফোন কল রেকর্ড করার সক্ষমতা’ ছিল। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘প্রমাণহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীদের ফোন থেকে ঠিক কী ধরনের তথ্য চীনা হ্যাকাররা পেয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ব্রিটেনের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বেশি সুরক্ষিত ছিল। তাঁদের মতে, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাজ্য বেশি ‘সতর্ক’ ছিল। তাঁরা ২০২১ সালের টেলিকমিউনিকেশনস সিকিউরিটি অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেছেন। এই আইনের মাধ্যমে টেলিকম কোম্পানিগুলোর ওপর নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।

তবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, এই বৈশ্বিক অনুপ্রবেশ ছিল ‘গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে সফল অভিযানের একটি।’ গত বছর এক জনসাধারণের জন্য জারি করা সতর্কবার্তায় এফবিআই জানায়, চীনা ‘রাষ্ট্র–সমর্থিত সাইবার হুমকির কর্মচারীরা’ বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগ, সরকারি ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়, চুরি হওয়া এই তথ্য ‘শেষ পর্যন্ত চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সারা বিশ্বের লক্ষ্যবস্তুর যোগাযোগ ও চলাচল শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতা দেয়।’

এতে আরও বলা হয়, হ্যাকাররা প্রায়ই নেটওয়ার্কে ‘দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী প্রবেশাধিকার’ বজায় রাখে। ফলে এই কার্যক্রম এখনো চলমান থাকতে পারে। এই জনসতর্কবার্তায় যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারসহ (যা জিসিএইচকিউর জনসম্মুখে কাজ করা শাখা) বহু দেশের গোয়েন্দা সংস্থা স্বাক্ষর করেছে।

তবে ‘সল্ট টাইফুনে’ যুক্তরাজ্য আক্রান্ত হয়েছে—এমন একমাত্র সরকারি স্বীকৃতি এসেছে ‘যুক্তরাজ্যে কিছু কার্যকলাপের একটি ক্লাস্টার’ বলে অস্পষ্ট উল্লেখের মাধ্যমে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হামলার ব্যাপকতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁরা স্বীকার করেছেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স ও কামালা হ্যারিসকেও চীনা হ্যাকাররা লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

দ্য টেলিগ্রাফকে জানানো হয়, ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীদের ফোন এবং সরকারের বিভিন্ন অংশে ‘অনেক’ আলাদা আলাদা হ্যাকিং হামলা হয়েছিল। বিশেষ করে ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে (২০২২–২০২৪) এসব হামলা বেশি ছিল। গত বছর প্রযুক্তিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর পিটার কাইল বলেন, তিনি তখন ‘খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে আমাদের দেশে একটি সাইবার নিরাপত্তা সংকট রয়েছে, যা আগে সচিব হওয়ার আগে আমি বুঝতেই পারিনি।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের ডাকোটা ক্যারি বলেন, ‘সল্ট টাইফুন মূলত টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ও তাদের নেটওয়ার্কের ব্যাক–এন্ডে মনোযোগ দিয়েছে, যাতে ব্যক্তিদের মধ্যকার যোগাযোগ সংগ্রহ করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, ব্রিটিশ রাজনীতিতে এমপিদের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে চীন আগ্রহী।’ তিনি সাম্প্রতিক ওয়েস্টমিনস্টার গুপ্তচর মামলার কথা উল্লেখ করেন।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেইজিংকে সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ও সাইবার যুদ্ধে সবচেয়ে দক্ষ ও আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করে। সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রধান ইউভাল ওলম্যান বলেন, সল্ট টাইফুন সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির জগতে ‘সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি।’

সাইবারসিকিউরিটি প্ল্যাটফর্ম সাইবারপ্রুফের প্রেসিডেন্ট ওলম্যান বলেন, ‘জনসমক্ষে যেসব প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, বাস্তবে সল্ট টাইফুনের কার্যক্রম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতেও বিস্তৃত। সেখানে তারা টেলিকম প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও প্রযুক্তি কোম্পানিকে লক্ষ্য করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৩ ও ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও নিশ্চিতভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে।’

এই কৌশলগত গুপ্তচরবৃত্তি অভিযানে ‘সরকারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যোগাযোগ রাউটিং এবং ভৌগোলিক মেটাডাটা’ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। গত মাসে পার্লামেন্টের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিটি জানায়, ‘সরকারের চীন নিয়ে কোনো কৌশলই নেই, কার্যকর কৌশল তো দূরের কথা।’ তারা আরও বলে, চীনের হুমকির জবাবে সরকার ‘সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ।’

ব্রিটিশ সরকার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘চীন সাইবার নিরাপত্তার দৃঢ় রক্ষক এবং সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ও হামলার অন্যতম বড় ভুক্তভোগী। আমরা আইন অনুযায়ী সব ধরনের ক্ষতিকর সাইবার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে লড়াই করে আসছি এবং কখনোই সাইবার হামলাকে উৎসাহ, সমর্থন বা অনুমোদন দিই না। প্রমাণ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তার বিষয়কে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া বা অন্য দেশকে অভিযুক্ত করার চর্চার আমরা দৃঢ় বিরোধিতা করি।’

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.